ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন যেভাবে

প্রকাশনার সময়: ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১৬:০৪ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১৬:০৯

আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হলো ‘আল-হালিম’। আল্লাহর ক্ষেত্রে আল-হালিম হলো, যিনি তাঁর সৃষ্টির ওপর রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন, যদিও তাঁর সৃষ্টি রাগ করার মতো কিছু করেছে। অর্থাৎ মানুষ এমন কোনো কাজ করেছে, যার ফলে আল্লাহ মানুষের ওপর রাগান্বিত হতে পারেন। কিন্তু তিনি রাগান্বিত না হয়ে তাঁ বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। এজন্য তাঁকে বলা হয় ‘আল-হালিম’।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর চেয়ে বেশি ধৈর্যধারণকারী আর কেউ নেই। লোকেরা তাঁর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে, এরপরও তিনি তাদের বিপদমুখ রাখেন এবং রিজিক দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৯৯)

নিজের রাগ সংযত রাখা মুমিনের অন্যতম গুণা। আল্লাহ কোরআনে এই গুণের প্রশংসা করেন এবং যারা নিজেদের রাগ সংযত করে, তাদের তিনি তিনটি পুরস্কারের ঘোষণা দেন। সেগুলো হলো, এক. ক্ষমা করে দেবেন, দুই. জান্নাত দান করবেন, তিন. মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। (এগুলো তাদের জন্য) যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং রাগ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩-১৩৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছু সংবরণে নেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৮৯)

একবার এক লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পরামর্শ নিতে আসল। নবীজি তাকে পরামর্শ দিলেন, ‘রাগ করো না।’ লোকটি আরও উপদেশ নিতে চাইল। কিন্তু নবীজি প্রতিবারই তাকে বললেন, ‘রাগ করো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৬) তখন সে বুঝল যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে এই উপদেশই দিলেন। একটি মাত্র উপদেশ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ।

একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি কে?’ তারা বলল, ‘যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে।’ তখন নবীজি বলেন, ‘প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে পরাজিত করে। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)

যে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, সে মূলত তিনটি শক্তির ওপর বিজয়ী হয়। সেগুলো হলো, এক. যে নিজের নফসকে পরাজিত করে, দুই. নিজের সঙ্গে থাকা শয়তানকে পরাজিত করে, তিন. তাকে যে রাগান্বিত করে, ওই লোকটির সঙ্গে থাকা শয়তানকে সে পরাজিত করে।

আপনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী পড়লে অবাক হবেন। দেখবেন তাঁর জীবনে এত এত ঘটনা ঘটেছে, রাগান্বিত হবার মতো এত এত কারণ ছিল, কিন্তু তিনি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন।

আমরা দেখতে পাই, আমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে শান্তশিষ্ট, তারাও মাঝেমধ্যে রাগান্বিত হয়। কিন্তু নবীজি ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি তাঁর জীবনে একবারও নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাননি; তাঁর পরিবারের সঙ্গে হোক বা সাহাবিদের সঙ্গে হোক।

হ্যাঁ, তিনি রাগান্বিত হয়েছেন। কিন্তু, তাঁর রাগ তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। সাহাবিরা তাঁর চেহারা দেখে বুঝতে পারতেন যে, তিনি রাগ করেছেন; কিন্তু নবীজি কোনো কাজের মধ্যে তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন না।

এখন প্রশ্ন হলো, কিভাবে আমরা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?

১. দোয়া করা : দুজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে রাগান্বিত হলেন। একজন আরেকজনকে গালাগালি করলেন। রাগের আতিশায্যে একজনের চেহারা তো টগবগে লাল হয়ে গিয়েছিল, রগগুলো ফুলে উঠেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, ‘আমি এমন একটা দোয়া জানি, যেটা পড়লে রাগ দূর হয়ে যাবে। দোয়াটি হলো, উচ্চারণ : ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতয়ান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৮২)

২. অজু করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রাগ আসে শয়তান থেকে। শয়তানকে আগুন থেকে তৈরি করা হয়েছে। অতএব, তোমাদের কারও রাগ হলে সে যেন অজু করে নেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৮৪)

৩. কাজ কমিয়ে দেয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়, সে যেন বসে পড়ে। এতে যদি তার রাগ কমে, তাহলে তো ভালো; অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৮২)

৪. নীরবতা অবলম্বন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন নীরবতা অবলম্বন করে।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৪৪)

উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ হলো রাগ। কেউ আপনাকে কিছু বললে তার মুখ থামাতে পারবেন না। কিন্তু তার ওপর আপনি রাগ করবেন নাকি ক্ষমা করে দেবেন সেটা চাইলে করতে পারেন। সেটা আপনার নিয়ন্ত্রণে।

সাইকোলজিস্টরা বলেন, বেশিরভাগ রাগের অন্যতম কারণ হলো আমাদের ইগো। আপনি রাগ করেন কেন? কারণ, আপনি মনে করেন যে, আপনার মর্যাদা হানিকর কোনো কথা বলা হয়েছে বা কোনো কাজ করা হয়েছে। আপনি যদি নিজেকে ছোট করে দেখা শুরু করেন, বিনয়ী হন, উদারতা দেখান, দেখবেন রাগ করার মতো কারণ কমে আসবে।

আপনি যদি বিনয়ী হন, কেউ যদি আপনাকে কোনো কথা বলে, আপনি নিজেকে সংযত রাখতে পারবেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘যদি কোনো মানুষকে যাচাই করতে হয়, সে যখন শান্ত থাকে তখন যাচাই করো না; বরং সে যখন রাগান্বিত হয়, তখন তাকে যাচাই করো।’

নয়াশতাব্দী/আরআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ