রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

ইসলামে শিক্ষকদের মর্যাদা

প্রকাশনার সময়: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৮:২৪

১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কো মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের সূচনা করা হয়। এরপর ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১০০টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এটি দেশ-বিদেশে ‘শিক্ষক’ পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ সম্মান। শিক্ষকদের অবদান স্মরণ করার জন্য দিবসটি পালন করা হয়।

ইসলাম মানুষকে জ্ঞানের পথে চলতে বলে, জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে। জাহেলি আরবে শিক্ষিত লোক ছিল মাত্র ১৭ জন। তৎকালীন সমাজ ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার এটাও একটা কারণ ছিল।

মহান আল্লাহ সে অন্ধকার সমাজে সর্বপ্রথম নির্দেশ দিলেন, ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন ... তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক: ১-৫)

এ আয়াত থেকেই মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চা ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইসলাম শিক্ষকসহ জ্ঞানচর্চা ও প্রসারের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা যুমার : ৯) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যাকে জ্ঞান দান করা হয়েছে তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা : ২৬৯)

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ছিল শিক্ষকদের ব্যাপক মর্যাদা। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন কর এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব শিষ্টাচার শিখ। তাকে সম্মান কর; যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন কর।’

সুতরাং যার থেকে জ্ঞান অর্জন করা হয় তিনিই আমাদের শিক্ষক। একবার জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) তার সওয়ারিতে ওঠার জন্য রেকাবে পা রাখলেন। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) রেকাবটি শক্ত করে ধরেন। জায়েদ ইবনে সাবিত বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুলের (সা.) চাচাতো ভাই! আপনি (রেকাব থেকে) হাত সরান।’ উত্তরে ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, ‘ না’, আলেম ও বড়দের সঙ্গে এমন সম্মানসূচক আচরণই করতে হয়।’

জ্ঞানই মানুষের যথার্থ শক্তি ও মুক্তির পথনির্দেশ দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলেছেন- ‘আমাকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে বা আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।’

প্রিয়নবী (সা.) শিক্ষা, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক ও শিক্ষার ব্যাপকীকরণে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাইতো প্রিয়নবী বদরের যুদ্ধবন্দিদেরকে মুক্তির জন্য মদিনার শিশুদের শিক্ষা দেয়ার চুক্তি করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি বন্দিদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন জনৈক বয়স্ক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হলে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম নিজ স্থান থেকে সরে তাকে জায়গা করে দেন। তখন তিনি ইরশাদ করেন, ‘যারা ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান করে না, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি)

ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষকতা অতি সম্মানিত ও মহান পেশা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সামাজিক দায়িত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকতার পেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে আমাদের সমাজে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও শারীরিকভাবে নিগৃহীত হতে দেখা যায়। যা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও অমানবিক কাজ। আবার অনেক শিক্ষককে দেখা যায়, ‘শিক্ষকতার এ মহান পেশাকে কলংকিত করে নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত কাজে জড়িয়ে পড়ে; এটাও অত্যন্ত ঘৃণিত ও বর্জণীয় কাজ।

অথচ প্রিয়নবী (সা.) ঘোষণা করেছেন- ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ছাড়া কেউই আমার আপন নয়।’ পরিশেষে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার হোক; শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান। আসুন প্রিয়নবী (সা.)-এর হাদিসের অনুসরণ করি। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিই। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করে দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ