ঢাকা, শনিবার, ১০ জুন ২০২৩, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, ২০ জিলকদ ১৪৪৪

যে ছয় কাজে অন্তর কঠিন হয়ে যায়

প্রকাশনার সময়: ২৫ মে ২০২৩, ১২:৪৮

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো! শরীরের মধ্যে এমন এক টুকরা গোশত রয়েছে, যা সুস্থ থাকলে সারা শরীরই সুস্থ থাকে, আর এটা অসুস্থ হয়ে গেলে সারা শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো, আর এটাই হলো ক্বলব।’ (মুসলিম: ১৫৯৯)

ওপরে হাদিস থেকে এটা স্পষ্ট, আমাদের উচিৎ ক্রমাগত আমাদের হূদয়কে পরীক্ষা করে দেখা, যাতে তা কঠিন না হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন—‘...অতএব ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের হূদয় কঠিন হয়ে গেছে আল্লাহর স্মরণ থেকে। তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিপতিত।’ (সুরা আয-যুমার: ২২)

আমাদের অন্তর যখন পাথর হয়ে যায়, তখন আল্লাহর ইবাদত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি দৈনিক ন্যূনতম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াও কঠিন মনে হয়। আর এভাবে চলতে থাকলে অন্তরটা ধীরে ধীরে আরো কঠোর হয়ে যায়। এই অবস্থায় আমরা যখন কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করি, আমরা কিছুই অনুভব করি না; যখন আমরা ইসলামী বক্তৃতা শুনি, তখন তা আমাদের মনে কোনো প্রভাব ফেলে না; কোনো কিছুই তখন আর আমাদের হূদয়কে স্পর্শ করে না; আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের দুঃখ-কষ্টে আমাদের চোখে আর পানি আসে না। আমরা যদি আমাদের হূদয়কে এই অবস্থায় থাকতে দেই, তাহলে শীঘ্রই তা মরে যাবে।

কোরআন-সুন্নাহে বর্ণিত হূদয় শক্ত হওয়ার কিছু কারণ—

১. গুনাহ ও পাপাচার

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মুমিন বান্দা যখন গুনাহ করে তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। এরপর সে তাওবা করে ক্ষমা চাইলে তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায় (কালিমুক্ত হয়)। আর যদি গুনাহ বেশি হয় তাহলে কালো দাগও বেশি হয়। অবশেষে তা তার অন্তরকে ঢেকে ফেলে।’ (তিরমিজি: ৩৩৩৪)

এটা সেই মরিচা, যার ব্যাপারে কোরআনে আল্লাহ বলেছেন: ‘কখনো নয়; বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে জং ধরিয়েছে।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ১৪)

মানুষ যতই পাপ করে ততই তার হূদয় কঠিন হয়ে যায়। সে তখন অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ে। কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাপ করার পরপরই ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে এবং হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে হবে।

২. অত্যাধিক হাসি-কৌতুক

একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্ব কিন্তু সহজ। আমরা সবসময় খুব রুক্ষ এবং কঠোর নই। আমরা মানুষের প্রতি সব সময় আমরা ভ্রুকুটি করি না। আমরা হাসি এবং রসিকতা করি। কিন্তু সবসময় সংযম বজায় রাখি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অল্প হাসুন, অধিক হাসি হূদয়কে হত্যা করে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ)

৩. আল্লাহর নাম ব্যতীত অত্যাধিক অনর্থক কথাবার্তা

ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ্ তায়ালার জিকির ছাড়া বেশি কথা বলো না। কেননা আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া বেশি কথা বললে অন্তর কঠিন হয়ে যায়। আর নিঃসন্দেহে কঠিন অন্তরের লোকই আল্লাহ তায়ালা থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকে।’

৪. অতিরিক্ত খাওয়া

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, এক লোক খুব বেশি পরিমাণে আহার করত। লোকটি মুসলিম হলে অল্প আহার করতে লাগল। ব্যাপারটি রাসুলের (সা.) কাছে উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন, মুমিন এক পেটে খায়, আর কাফির খায় সাত পেটে।’ (মুসলিম: ৬০৬৩)

আমরা যখন খাওয়া-দাওয়ায় বেশি মনোযোগ দেই, তখন হূদয়ের প্রতি মনোনিবেশ করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। অত্যাধিক খাওয়া আমাদের শরীরের মেটাবলিজমকে দুর্বল করে, আমাদের অলস করে তোলে এবং অতি ভোজ অনেক ধরনের শারীরিক রোগের পূর্বসূরিও বটে। অতিমাত্রায় খাওয়া-দাওয়া লোভ এবং দুনিয়া প্রেমের বহিঃপ্রকাশ।

৫. দুনিয়া নিয়ে ব্যতিব্যস্ততা

আল্লাহ তায়ালা বলেন— ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আল-মুনাফিকুন: ৯)

সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুটি ধ্বংসের কারণ, আর সেজন্যই আল্লাহ ওপরের আয়াতে এই দুইটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এই জীবনের সমস্ত কিছু যা আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে বিক্ষিপ্ত করে, এবং ব্যতিব্যস্ত করে রাখে, তাই আমাদেরকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়।

কাব ইবনু মালিক আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেয়া হলে তা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও প্রতিপত্তির লোভ এর চেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করে তার ধর্মের।’ (আত-তিরমিজি : ২৩৭৬)

৬. সুন্নত ত্যাগ করা

ফরজ ব্যতীত আল্লাহর রাসুলের (সা.) আমলগুলোই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বোত্তম উপায়। আমাদের মধ্যে কেউই আল্লাহকে রাসুলের (সা.) চেয়ে ভালো জানি না। তিনি যেভাবে আল্লাহর ইবাদত করতেন সেটিই সর্বোত্তম পথ। এইভাবে রাসুলের (সা.) প্রথা এবং অনুশীলন ত্যাগ করার অর্থ হলো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য উদ্যমের অভাব এবং রাসুলের (সা.) প্রতি ভালোবাসার অভাব। আল্লাহ বলেন— ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাও...।’ (সুরা আল-হাদিদ: ২১)

আমরা যদি প্রতিদিনের ভিত্তিতে সুন্নতকে অবহেলা করি তবে আমরা অবশ্যই আল্লাহর দিকে দৌড়াচ্ছি না, আমরা সম্ভবত শামুকের মতো হামাগুড়ি দিচ্ছি।

হাদিসে কুদসিতে এসেছে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন— ‘আমার বান্দা যেসব ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ওই ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো ইবাদত নেই যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে।’ (বুখারি: ৬৫২০)

অবলম্বনে : understandQuran

নয়াশতাব্দী/জেডএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ