ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

যত প্রথমের তত কথন

প্রকাশনার সময়: ২৬ জুন ২০২২, ২০:২৪ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২২, ০০:০৩

১.

জীবনের প্রথম হওয়ার দৌড়ে আমরা সকলেই এক প্রকার সামিল হয়েছি। কেউ কেউ হয়েছি, আবার অনেকেই নয়। তবুও আমাদের প্রথম হওয়ার বাসনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। আবার প্রথম হতে পারলে আশপাশ থেকে অজস্র বাহবাও মেলে। প্রথম হই বা না হই; আমরা থেমে নেই। কেউ ভালো কাজে প্রথম, কেউবা মন্দে। যখন যেখানে আলোচনা হয়, ‘প্রথম’ নিয়েই শুরু করি। কে কখন কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় ‘প্রথম’ হলো— এসব তথ‌্য উপাত্ত জানারও প্রবল আগ্রহ আমাদের। আমিও এর/ওর মতো প্রথম হতে চাই। এটাই স্বপ্ন-সাধনা।

‘প্রথম’ হতে পারা-ই একপ্রকার যোগ্যতা মনে করি আমরা। সেটা ভালো অথবা মন্দ!

২. বিষয়বস্তু পদ্মা সেতু। হ‌্যাঁ, ২৫ জুন আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়ে গেলো। যার পরতে পরতে রয়েছে এদেশের আবেগ-অনুভূতি। পদ্মা সেতু বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের বড় বিজ্ঞাপন, সেটা অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প এটি। প্রায় নয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে বিশ্বের অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বে খরস্রোতা যতো নদী আছে তার একটি এই পদ্মা। এর চাইতে বেশি পানির প্রবাহ আছে পৃথিবীর একটি মাত্র নদীতে, সেটি আমাজন। তবে ওই নদীর ওপর কোনও সেতু নেই। সে হিসেবে খরস্রোতা নদীর ওপর পদ্মা সেতুই প্রথম।

প্রকৌশলীরা এমনও বলেছেন, বর্ষাকালে নির্মাণকাজের সময় পদ্মা নদীতে বার্জ, ড্রেজার ও ক্রেনকে থর থর করে কাঁপতে দেখা গেছে। তারা বলছেন, সেতুটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে এর শক্তিশালী পিলার নদীর প্রবল স্রোতের তোড়েও টিকে থাকতে পারে। মাটি ১২০-১২২ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো একটি রেকর্ড। পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনও সেতুতে পাইল এত গভীরে প্রবেশ করাতে হয়নি।

নদী শাসন করা হয়েছে ১৪ কিলোমিটার (১.৬ মাওয়া+১২.৪ জাজিরা) এলাকা। পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটি আনা হয়েছিল চীন থেকে। বিশ্বে প্রথম এই সেতু বানাতেই এত দীর্ঘদিন ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। আরেকটি রেকর্ড, পদ্মা সেতুই বিশ্বে প্রথম যেটি কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে নির্মিত হয়েছে। শক্তিশালী হ্যামার দিয়ে নদীর তলদেশে মাটির গভীরে প্রবেশ করানো হয় এ লম্বা পাইলগুলো। এত লম্বা দৈর্ঘ্যের পাইল ব্যবহার করা হয়নি পৃথিবীর আর কোনও সেতুতে।

উদ্বোধনের দিন পদ্মা সেতুতে প্রথম টোল দিয়ে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতুতে টোল বুথের দায়িত্বে আছেন নারীরাও। টোল প্লাজায় নারীদের দায়িত্ব দেওয়া পদ্মা সেতুতে প্রথম।

এমন অনেক ইতিবাচক গল্পের ‘প্রথম’ পদ্মা সেতু।

৩. উদ্বোধনের পর দিন অর্থাৎ ২৬ জুন থেকেই সর্বসাধারণের জন‌্য খুলে দেওয়া হয় পদ্মা সেতু। স্বভাবতই স্বপ্নের এই সেতু দেখতে/পার হতে জনস্রোত হবে— এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের শুরুটা হলো অদ্ভুত কিছু আলোচনা দিয়ে। গণমাধ‌্যমে খবর— কোন ব্যক্তি পদ্মা সেতুতে প্রথম টোল দিয়ে পার হলেন।

নিউ মিডিয়ার যুগে পাঠকদের কাছে দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প নেই। তবে এমন সংবাদের প্রয়োজনীয়তা আদৌ কতটুকু— সেটা ঠিক বোধগম্য নয়। এরপরই খবর এলো, লেডি বাইকার হিসেবে কে প্রথম সেতু পাড়ি দিলেন। ফাঁকে জাতীয় এক সংবাদমাধ‌্যমে দুই যুবক দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর পরপরই তারা টোল দিয়ে সেতু পার হন। আবার দুপুরের পর চোখের সামনে খবর— ‘পদ্মা সেতুতে প্রথম জরিমানা দিলেন মাদারীপুরের আয়ূব খান’। এ ছাড়াও উদ্বোধনের দিন চোখে পড়লো, লোহার বেড়া ভেঙে সেতুতে প্রবেশ করছেন উৎসুক জনতা। যে ফুটেজ এখন ভাইরাল।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ‌মাধ‌্যমে কথিত আরও ‘প্রথম’ হওয়ার কিছু স্থিরচিত্র প্রকাশ হয়। সেখানে সেতুর ওপর মূত্র বিসর্জন করতেও একজনকে দেখা গেছে। আরেকজনকে দেখা গেছে, সেতুর নাট-বল্টু খুলতে। অনেকে শুয়ে, বসে, সিজদা দিয়ে নিজেদের ‘প্রথম’ করার দৌড়ে নেমেছেন। দাবি তুলেছেন— এসবও গণমাধ‌্যমে প্রকাশ হোক। কিন্তু কেন? এত ‘প্রথম’ দিয়ে হবে কী, দেশের কোন উন্নয়নে আসবে?

৪. প্রত‌্যেকেই গর্ব করতে ‘প্রথম’ হতে চায়। যে ‘প্রথম’ নিয়ে আগামী প্রজন্ম মাতামাতি করবে। সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবে; যেমনটা এখনকার প্রজন্ম তার ৫০ বছর আগের ইতিহাস নিয়ে করে। কিন্তু একটা সেতুর সঙ্গে ‘হাস‌্যকর প্রথম’ হওয়ার যোগসূত্র কী? যেখানে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক দিকটাই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। সারা বিশ্ব আজ পদ্মা সেতুর দিকে তাকিয়ে। সেখানে আমাদের দৃষ্টিকটু এসব দৃশ‌্য কতটাই গ্রহণযোগ্য।

পদ্মা সেতুতে কী কী করা যাবে- এমন নির্দেশনা সরকার থেকেই আগেই দেওয়া হয়েছে। আমরা এর কত শতাংশ মানতে পেরেছি? প্রশাসন কতটুকু মানাতে পেরেছে এই আইন, সেটা কদিন পর আরও পরিষ্কার হবে। তবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদেরও সভ‌্য হয়ে উঠার সময় এসেছে। শুধু অবকাঠামোতেই উন্নয়ন করলে হবে না। উন্নয়ন ঘটাতে হবে নিজস্ব চিন্তা, মানসিকতা আর মস্তিষ্কের।

দিনশেষে আমরাও এমন ভাবনা করতে চাই- নেতিবাচক ‘প্রথম’ পরিহার হোক, আধুনিক চিন্তা গড়ে উঠুক।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক, রাইজিংবিডি ডটকম।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ