ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

নারীর পোশাক নয়, দায়ী পুরুষের মানসিকতা

প্রকাশনার সময়: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:৩৫

শিরোনামটি যে সত্য, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বাবার দ্বারা কন্যা ধর্ষণের অসংখ্য সংবাদে। বাবা, দাদা, নানা, চাচা, মামাসহ বিভিন্ন সম্পর্কের মানুষেরা ধর্ষণ করছে নারীদেরকে। কারণ পোশাক নয়; লাম্পট্য। ধর্মহীন-মানবতাহীন-নির্মম লাম্পট্যময় খুব ভয়ংকর সময় পার করছে বাংলাদেশ। এই দুঃসহ ভয়ংকর সময়ের সূত্রতা তৈরি হয় স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত ধরে। পাক বাহিনীর হাতেও ছিল লাম্পট্যর ছাপ। সেই ছাপ লেগে আছে ৫১ বছর পরের বাংলাদেশে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অন্ধকারের সঙ্গে বসবাস শুরু হয় আমাদের মায়েদের- বোনেদের। সবসময় তারা সতর্ক থাকে, সতর্ক রাখে নিজেকে-পরিবারকে। কিন্তু তবু বাংলাদেশে বিপদ এসে ভর করেছে ছাত্রী-তরুণী-নারীদের ওপর। একটু অতীতের দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে— উনিশশো পঁচানব্বই সালের ২৩শে আগস্ট দিবাগত রাত। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি বাসে করে দিনাজপুরের দশমাইল মোড় এলাকায় নামে ইয়াসমিন আক্তার নামে এক কিশোরী। তার বয়স আনুমানিক ১৬ বছর। ইয়াসমিন আক্তার ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতেন। ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী একটি বাসে চড়েছিলেন তিনি। দিনাজপুরের দশমাইল মোড় এলাকায় একটি পানের দোকানের সামনে সেই কিশোরী অপেক্ষা করছিলেন দিনাজপুরগামী বাসের জন্য। সেসময় টহল পুলিশের একটি ভ্যান সেখানে হাজির হয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মেয়েটিকে পরামর্শ দেয় যে পুলিশের গাড়িতে করে দিনাজপুর শহরে যেতে। কিন্তু পুলিশের ভ্যানে করে সেই কিশোরী দিনাজপুর শহরে যেতে রাজি ছিলেন না। তখন পুলিশ সদস্যরা বলেন যে এত রাতে তার সেখানে একা থাকা নিরাপদ নয়। পুলিশের সেই ভ্যানে ছিলেন একজন এএসআই এবং দুইজন কনস্টেবল। শেষ পর্যন্ত খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিশোরীটি পুলিশের ভ্যানে ওঠেন। এর পরের দিন সকালে কিশোরীটির মৃতদেহ পাওয়া পাওয়া যায় গোবিন্দপুর নামক জায়গায়। এ ঘটনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সংগঠন বিচারের দাবিতে নানা প্রতিবাদ করতে থাকে। এ খবর ছড়িয়ে গেলে ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দিনাজপুর। বিভিন্ন সরকারি অফিসে ভাংচুর চালিয়ে তছনছ করা হয়। দিনাজপুর শহরে কাস্টমস গুদামে মালামাল লুট করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসেও আক্রমণ করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দিনাজপুর শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিডিআর মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিনাজপুর শহরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু এই কারফিউকে আমলে নেয়নি সাধারণ মানুষ। কারফিউ উপেক্ষা করেই বিভিন্ন জায়গায় মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এক পর্যায়ে ঘটনার দুইদিন পরে এলাকাবাসী কোতোয়ালী থানা আক্রমণ করে সারারাত থানা অবরুদ্ধ করে রাখে। সেসময় কোনো পুলিশ সদস্য থানা থেকে বের হতে পারেনি। পরের দিন দিনাজপুর শহরে শতশত মানুষ বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় কয়েকটি জায়গায় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভের মাত্রা এতটাই তীব্র হয়েছিলে যে পুলিশ মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে এবং তাতে সাতজন নিহত হয়। নিহত ইয়াসমিন আক্তারের গায়েবানা জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিনাজপুরের প্রশাসন কার্যত অচল পড়েছিল।

ইতিহাস সবসময় সত্যের পথে থাকে। হয়তো এ কারণেই ইতিহাস শেখায়, ইতিহাস দেখায় আলোর পথ। এই পথ ধরে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। আইনের সংস্কৃতি গড়তে পারেনি ৫০ পেরিয়ে ৫১তে এসেও। বরং সেই ইয়াসমিন হত্যার বিচার করতে সময় নিয়েছে প্রায় ৯ বছর। আর এতে করেই উৎসাহিত হয়েছে ধর্ষকেরা, নির্ভয়ে একের পর এক ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রতিদিন ঘটাচ্ছে সেই ধর্ষকেরা ১৪টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা। নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে ছ’শতটিরও বেশি। পুলিশের সেই ধর্ষণের ইতিহাস সৃষ্টি দৃষ্টি ঘুরিয়েছে ছাত্র-যুব-জনতার একটি লম্পট শ্রেণিকে। অন্যদিকে পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এতটাই চরমে ওঠে যে পুলিশ সদস্যরা রীতিমতো লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। এমন অতীতেরও আড়াই হাজার বছর আগের একটা অতীত তুলে ধরছি, যেখানে নির্মমতায় অন্ধকার নেমে এসেছিল। অতি শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটেছিল এই অন্ধকারের পথ ধরে। আর সেই পতনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুক্রেসিয়ার নাম। বলা হয়, রোমান সাম্রাজ্যের শেষ রাজার গুণধর পুত্র লুক্রেসিয়াকে ধর্ষণ করেছিল। লুক্রেসিয়া মনে করে এই জঘন্য অপরাধ তার এবং তার পরিবারের সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। সে বিচার চায়। তার প্রার্থনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় যা তার সম্মানকে আরও কলুষিত করে। তবে লুক্রেসিয়া তাদের সেই সুযোগ বেশি সময় দেননি। বিতর্ক চলাকালে সে একটা ছুরি নিজের বুকে বসিয়ে দেয়; লুক্রেসিয়া আত্মহত্যা করে। এই ঘটনায় জনগণের ভিতর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা ক্ষুব্ধ হয়। এমনটাও বলা হয় যে ব্রুটাস তখন লুক্রেসিয়ার বুকে বিদ্ধ ছুরি বের করে প্রতিজ্ঞা করেন লুক্রেসিয়ার অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার। নানা অন্যায় অবিচার এবং শোষণ নির্যাতনে ক্ষুব্ধ জনগণ ব্রুটাসকে সমর্থন জানায়। শুরু হয় রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, রাজনৈতিক বিপ্লব। রোমান সেনাবাহিনীও জনগণের বিদ্রোহকে সমর্থন জানায়। পতন ঘটে রোমান সাম্রাজ্যের। ধর্ষণ থামাতে ব্যর্থতার হাত ধরে অসংখ্য সরকারের পতন নির্মিত হয়েছিল। আর তাই পতন ঠেকাতে সতর্ক ছিলেন যারা, তারা টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন নিজের সাম্রাজ্য। তাই বর্তমান সরকারের প্রয়োজন হবে বাংলাদেশের মাটি-মানুষকে বাঁচানোর জন্য, নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও ধর্ষণ থামাতে আইনের সংস্কৃতি নির্মাণ করা এখন নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে নিতে হবে। তা না নিলে, ক্ষমতা থাকবে কি না জানি না, তবে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নেমে আসবে আরও গহীন অন্ধকার। যা কারোই প্রত্যাশা না। তাই চাই— সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে প্রতিটি ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতকের যাবজ্জীবন।

ধর্ষণের বিচার হচ্ছে না, ধর্ষণ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তারই প্রেক্ষিতে গাজীপুরে এক বাবা তার ৮ বছরের কন্যা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের বিচার চেয়ে না পেয়ে শিশুকে নিয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। এমন নিদারুণ সময়ের হাত ধরে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে ছাত্র-যুব-জনতাকে অবিরাম মানবতাহীন নির্মম কষ্ট দিয়ে। কষ্টসময়ে এসে সংবাদযোদ্ধা হিসেবে, বাংলাদেশের রাজপথে থাকা সচেতন নাগরিক হিসেবে গণমাধ্যম নিয়মিত পড়ার কারণে লক্ষ করেছি— গত ৩ বছরে ধর্ষণ সংক্রান্ত ৩ হাজার ৪০০টি ঘটনা ঘটেছে। আমাদের দেশে আকাশ-সড়ক-রেল ও নৌপথের বিভিন্ন যানবাহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, এমনকি বাড়িতে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। বর্তমানে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিটি ক্ষেত্রই উদ্বেগজনকহারে বেড়ে চলেছে। এখনই সময় নারীদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিদিনই দেখছি নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দেশের প্রত্যেক কর্মক্ষেত্রেই যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নিশ্চিত ও কার্যকর করা গেলে নারীদের প্রতি এই ধরনের সহিংসতার ঘটনা রোধ করা সম্ভব। নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলেও চাকরি হারানোর ভয়ে, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে তারা অভিযোগ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সমাজের সবার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে।

পোশাকই ধর্ষণের কারণ হিসেবে বাংলাদেশের একটি শ্রেণি চিহ্নিত করতে উঠে পরে লেগেছে। তাদের হয়তো জানা নেই পবিত্র কোরআন বলছে— ‘তোমরা তোমাদের দৃষ্টি-লজ্জাস্থান ও জিহ্বাকে সংযত রাখো।’ ধর্মীয় অনুশাসন না মানায় অন্ধকার নেমে আসছে, নারী-পুরুষ সবাই যদি ধর্মীয় অনুশাসন মানে ভালোই হবে বলে ধারণা করছেন ধর্মীয় আলেমগণ। অন্যদিকে আমি মনে করি— ধর্ম মানা না মানা কোনো বিষয় নয়; মানবিক হলেই পৃথিবী কল্যাণকর হতে পারে। সেই পৃথিবীতে নারীর পোশাক নয়; পুরুষের দৃষ্টি সংযত রাখাই হোক কল্যাণের পথ। একই সঙ্গে বলব, যারা ধর্ম না মেনে, মানবতাকে না মেনে অপরাধ-ধর্ষণ করে যাচ্ছে। সেই অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করার ফলে ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশে যৌন হয়রানির বর্তমান পরিস্থিতিতে সারাদেশে নারীরা অসহায়। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সোচ্চার হওয়ার মতো কাউকে তারা পায় না।

ধর্ষণ-নির্যাতন-নিষ্পেষণের রাস্তা ধরে ক্রমশ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে কষ্ট-যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণায় কাতর কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনুর পরিবারের সদস্যরা। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। লাশ উদ্ধার হয়েছে, কিন্তু তনু হত্যা রহস্য আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্র গত এক বছরেও তনু হত্যাকারীদের খুঁজে পায়নি। আস্তে আস্তে তনুও আমাদের স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে। তার মা-বাবা বিচার পাবেন কি না কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। নতুন কোনো তনুর কথা আমরা জানতে পারি। আগের তনু আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে যায়। অথচ তনু খুনের পর প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সারাদেশে। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানির ঘটনা আমাদের দেশে হরহামেশায় ঘটছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার সংখ্যা অতি নগণ্য। যে কারণে এমন ঘটনা বাড়ছে বৈ কমছে না! নির্যাতনের শিকার হয়ে অপমানে কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। বেদনার বালু চরে দাঁড়িয়ে বলছি-লিখছি-প্রতিবাদ করছি। একটা কথা অবশ্য সত্য। আর তা হলো— ধর্ষক ও যৌন হয়রানিকারীরা কোনো ধর্ম মানে না, কোনো আইন মানে না। তারা যেমন অসুস্থ; তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজ যে দৃষ্টিতে ধর্ষণ ঘটনাকে দেখে সেটাও সুস্থ কোনো কিছু ইঙ্গিত করে না। রাষ্ট্র দুই একটা আইনি বিধান করেই তার দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে। আবার যাদের ওপর সেই আইন প্রয়োগের ভার দেয়া হয়েছে তাদের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার, যা অতি আবশ্যক। সেই আবশ্যকীয়তার কথা ভেবে বলতে চাই— আইনের সংস্কৃতি তৈরি করা এখন নৈতিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেখতে চাই, দেখতে চাই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমাজ-মানবতার পক্ষে...

লেখক: চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ