ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

মুজিব আদর্শের সৈনিকদের গায়ে কেন দুর্নীতির কলঙ্ক?

প্রকাশনার সময়: ২৪ আগস্ট ২০২২, ১২:৫৪

নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে এখন এগিয়ে চলছে সমগ্র বিশ্ব। বিশ্বের কোথাও আজ জীবনের নিরাপত্তা নেই। নেই মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা। সবদেশের মানুষই আজ আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘ দুই বছর পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমেছিল চরম ধ্বস। করোনা মহামারির প্রভাব কিছু কমে আসলে মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল একটি সুখী-সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায়। কিন্তু আমেরিকার ষড়যন্ত্রে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধে ইউক্রেনের। এই যুদ্ধ পুরো পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর দারুণ চাপ সৃষ্টি করে। যেসব দেশের জ্বালানি সংকট আগে থেকেই চলমান ছিল, সেই সংকট আরো তীব্রতর হচ্ছে। গরিব দেশগুলোতে জ্বালানি সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতিসহ খাদ্য সংকট ঘণীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে চীন-তাইওয়ানের যুদ্ধের মহড়া যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি পারমাণবিক যুদ্ধে মোড় নেয়, তাহলে গোটা পৃথিবীই হুমকির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের সরকার প্রধান উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পরিণাম কী হবে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণে বিরোধী-পক্ষ হিসাব-নিকাশ করে দেখাচ্ছেন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও অর্থপাচার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পঙ্গু করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ যদিও এসব কথা স্বীকার করছে না— তবু জনমনে একটি প্রশ্ন নানা কারণেই উঁকি দিচ্ছে— মুজিব আদর্শের সৈনিকদের গায়ে কেন দুর্নীতির কলঙ্ক থাকবে? বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সততার সঙ্গেই আমৃত্যু রাজনীতি করেছেন। পৃথিবীর কেউই তার বিরুদ্ধে কখনো দুর্নীতির অভিযোগ আনতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যুর পরে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর ব্যাংক হিসাব তলব করে দেখতে পেয়েছিলেন সোনালি ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে তার নামে মাত্র তিন হাজার টাকা ছিল। এটা আমাদের জন্য একটা শিক্ষণীয় বিষয় হওয়ার কথা ছিল, অথচ আমরা দেখছি বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে চিরকাল সোচ্চার থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা দুর্নীতিকেই যেন বেশি করে চর্চা করছেন।

রাজনীতি কোনো লাভজনক ব্যবসা নয়, কিন্তু আজ আমরা চারদিকে দেখতে পাচ্ছি রাজনীতি টাকা কামানোর উৎকৃষ্ট ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যেক দলের মধ্যেই আজ কালো টাকার মালিকগণ প্রভাব বিস্তার করে চলছেন। সৎ মানুষের মূল্য দেশে যেমন নেই, কোনো রাজনৈতিক দলেও আশ্রয় পাচ্ছেন না সৎ মানুষেরা। এভাবে যদি দেশের বর্তমান রাজনীতি চলতে থাকে তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে রাজনীতি হুমকির মুখে পড়বে, ক্ষমতায় আসবে অরাজনৈতিক সরকার— যা জনগণের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে না।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক এখনো গ্রামে বাস করে এবং দিনরাত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে। যে ২০ ভাগ লোক কৃষি কাজের বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য-রাজনীতি-চাকরি-বাকরি করে তারাই লিপ্ত হয় দুর্নীতিতে। দুর্নীতি আজ বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে এমন কোনো সরকারি খাত নেই যে খাতে দুর্নীতি হচ্ছে না। কোথায়, কীভাবে দুর্নীতি হচ্ছে তা শনাক্ত করা গেলেও সমাধান করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা কিছুতেই এড়ানো যায় না। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সরকারি সেবাখাত বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। অথচ একই সেবা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরিত হলে লাভ হয় প্রচুর। সরকারি খাত যেখানে লোকসানে পড়ে, বেসরকারি খাত সেখান থেকেই মুনাফা করে। কেন এমনটি হয় তা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করার জন্যই দলের ভেতর অনুপ্রবেশ করে। এই অনুপ্রবেশকারীদের দূরভিসন্ধি বুঝে সতর্ক না হলে সরকারি দলকেই এর দায়ভার নিতে হবে। বাংলাদেশে আগে যেমন দুর্নীতি হতো এখনো তেমনিভাবে দুর্নীতি হয়। দুর্নীতির সঙ্গে যারা যুক্ত থাকে তারা প্রত্যেকেই প্রচুর ক্ষমতাবান। ক্ষমতার চেয়ারে বসে তারা দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের পেট ভরে নিচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলো যখন এই দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতির টাকায় ভরে উপচে পড়ছে তখন তারা টাকা পাচার করে দিচ্ছে বিদেশে। বিদেশে একবার দেশের টাকা পাচার হয়ে গেলে তা আর কোনোদিনই দেশে ফেরত আসে না। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশ হচ্ছে— এসব খবর পড়ে মানুষ ক্রমাগত হতাশ হয়ে পড়ছে, বাড়ছে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। এই ক্ষোভ যখন দ্রোহে পরিণত হবে, সেদিন পরিস্থিতি চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গুলি করে, রাস্তায় রাস্তায় কামান, ট্যাংক বসিয়ে গণমানুষের মিছিল কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। এশিয়ার বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র এর মধ্যে সংকটে পড়েছে দুর্নীতির কারণে। এর মধ্যে শ্রীলংকার উদাহরণই এখন সবচেয়ে জ্বলজ্বলে। শ্রীলংকার দেউলিয়া হওয়ার পেছনে ছিল ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন দুর্নীতি। শ্রীলংকার রাজনীতিতে জবাবদিহিতার কোনো বালাই ছিল না। পরিবারতন্ত্র যেখানে এমনভাবে দুর্নীতির শিড়ক বিস্তার করেছিল যে রাজার গৃহ ভস্ম হয়েছে প্রজার লাগানো আগুনে।

বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটে আছে এ কথা যেমন সত্য, এই সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে এটাও তেমন সত্য। দুর্নীতিবাজদের আসকারা দিয়ে সরকার দেশের মানুষের জীবনকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেললে দেশের মানুষ সেটা মেনে নিবে কেন? আমরা দেখেছি, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনারা প্রত্যাবর্তন করলে কাবুল বিমানবন্দরে কী দৃশ্য রচিত হয়েছিল, বাংলাদেশও যদি কখনো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়, তাহলে সেদিন কীভাবে দুর্নীতিবাজরা নিজেদের রক্ষা করবেন আমি সে কথা চিন্তা করে হতাশায় ডুবে যাই।

অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে দুর্নীতি বাংলাদেশে জাতীয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা পাঁচ বছরে, সেই প্রকল্প ১১ বছরেও শেষ হচ্ছে না। বছরের পর বছর প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ঋণের বোঝা চাপানো হচ্ছে জনগণের মাথার ওপর। সীমিত আয়ের মানুষ যারা, আজ তারা প্রত্যেকেই দিশেহারা। প্রান্তিক মানুষের দুর্ভোগ যত বাড়বে, সরকারের জন্য তা ততই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। কিছু মানুষের পেট ভরাতে গিয়ে পুরো দেশই এখন প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে ক্ষুধিত মানুষের মিছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল শোষিত বাংলাকে সোনার বাংলায় পরিণত করা। বঙ্গবন্ধু-কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এদেশের নিরীহ মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকলেও অনেক এমপি-মন্ত্রী-আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ক্রমে ক্রমে বাড়ছে। কারা এদেশে দুর্নীতিবাজ তা সরকার যেমন জানেন, দেশের মানুষও তা উপলব্ধি করতে পারছেন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। দলের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে যারা দলের ক্ষতি করছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করছে— এদের যদি সরকার শাস্তি না দেন, তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয়, জনতা যেদিন তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য নিজের হাতে আইন তুলে নেবেন। বাংলাদেশের মানুষ এখন একমাত্র জননেত্রী শেখ হাসিনার মুখের দিকে তাকিয়েই সব সমস্যা নীরবে সহ্য করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি তার দলীয় দুর্নীতিবাজদের যথাযথ শাস্তি না দেন, তাহলে মানুষের আর কোনো সান্ত্বনা থাকবে না।

দেশবিরোধীরা এখন গুজব ছড়িয়ে দেশকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দুর্নীতির সব ভয়াবহ চিত্র। ওয়াসার এমডির ৬ লক্ষাধিক টাকা বেতন সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামোর পরিপন্থী হলেও বছরের পর বছর তিনি অতিরিক্ত বেতন নিয়েই বহাল তবিয়তে আছেন। একজন এমডি কীভাবে এত ক্ষমতাধর হতে পারেন? আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীরাই বাড়িতে টাকার মেশিনে টাকা গুনেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে। কারা ক্যাসিনো সম্র্রাট ছিল, কারা টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট করে এদেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে তা মানুষ ভুলেনি। মানুষের জীবন যখন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে তখন এই বিষয়গুলোও প্রচারিত হচ্ছে মুখে মুখে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারকে একটি কথা মনে রাখতে হবে— পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি সীমা ছাড়িয়েছিল। সেই সরকারের পতন হয়েছিল ভয়ানকভাবে। বিএনপির আমলেও দুর্নীতি রেকর্ড ভেঙেছিল। জিয়াপুত্র তারেক-কোকোর দুর্নীতির কথা এদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। দুর্নীতির দায়ে জিয়াপত্নী বেগম খালেদা জিয়া আছেন জেলে, জিয়াপুত্র তারেক রহমান রাজনীতি না-করার মুচলেকা দিয়ে দেশ-পলাতক হয়েছেন, বিএনপি’র তৎকালীন মন্ত্রী-এমপি অনেকেই দুর্নীতির কারণে আদালত কর্তৃক নানা দণ্ডে দণ্ডিত। মানুষ অতীত ভুলে যায়, বাংলাদেশের মানুষও অতীত দুর্নীতি ভুলে গেছে। বর্তমান সরকারের উচিত হবে অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া। চলমান দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে না পারলে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারকেও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

দেশের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটে নিপতিত, তখন দুর্নীতিবাজদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা করা হোক। পি. কে. হালদার, ওসি প্রদীপের মতো অন্যান্য দুর্নীতিবাজদের সমস্ত সম্পতি বাজেয়াপ্ত করা হলে কিছুটা হলেও দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করতে হবে। বিদেশে খিচুড়ি রান্না করতে শিখতে যাওয়ার জন্য আমলাদের পাঠানোর দরকার নেই। ‘বালিশকাণ্ড’ বা ‘পর্দাকাণ্ড’ ঘটিয়ে যারা কোটিপতি হয়েছে তাদের বিচার করা হোক। যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা শত শত কোটি টাকার মালিক তাদেরকেও শাস্তি দেয়া হোক। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজদের ঠাঁই না হোক। দুর্নীতিবাজরা কোনো দলের জন্যই সম্মান বয়ে আনে না। এদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে না পারলে বর্তমান সরকারের সব অর্জন ভূলুণ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তার দলীয় নেতাকর্মীদের শরীর থেকে দুর্নীতির গন্ধ মুছে ফেলার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, এটাই আশা করে বাংলাদেশের মানুষ। আশা করি তিনি এই কাজটি করে বাংলাদেশে উদাহরণ সৃষ্টি করবেন।

মোনায়েম সরকার : রাজনীতিবিদ, লেখক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, গীতিকার ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ