ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

যানজট কি নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবে

প্রকাশনার সময়: ২৯ জুলাই ২০২২, ১২:৩৮

রাজধানী ঢাকা শহরে বসবাস এবং চলাচল যেন খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ চলাচলের পথে যানজট। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড় ও যানজট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে কেবল কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই তৈরি হচ্ছে যানজট। আধুনিক সড়ক ব্যবস্থা ব্যতিরেকে যানজট নিরসন সম্ভব নয় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও যানজট নিরসনে কোনো প্রকল্প বা উদ্যোগেই সফল হচ্ছে না সরকারের। ঢাকার সড়ক ও পরিবহন খাতে এক দশকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। অথচ এখনো রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহন চলছে ট্রাফিকের হাতের ইশারায়। স্বয়ংক্রিয় সব সিগন্যাল প্রায় অকার্যকর। নাজুক গণপরিবহন ব্যবস্থায় দুর্ভোগের শেষ নেই নগরবাসীর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।

এবার যানজট নিরসনে পাতাল রেল ও ভূগর্ভস্থ পরিবহন ব্যবস্থার (সাবওয়ে) দিকে মনোযোগ দিয়েছে সরকার। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশাল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক নির্মাণের পর ঢাকার যান চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে বলে আশা করা যায়। সরকার ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) তৈরি করেছিল, যা ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা; কিন্তু পরিকল্পনা অনুসারে অনেক কাজই হয়নি। এরপর ২০১৫ সালে সংশোধিত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) তৈরি করা হয়, যার মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। ঢাকায় যত প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে ও হবে, এর সবই এই পরিকল্পনার আওতায় হওয়ার কথা। আরএসটিপিতে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যানবাহন পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং বাস সেবার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অগ্রধিকার দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তা বাদ দিয়ে সরকার বিপুল ব্যয়ে উড়াল সড়কের মতো বড় প্রকল্পকে গুরুত্ব দিয়েছে; কিন্তু এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ তো কমেনি, বরং কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক সূচকে বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় ঢাকা প্রথম দিকেই থাকছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার জরিপে ঢাকায় অপরাধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো সূচকগুলোর পাশাপাশি সড়ক ও গণপরিবহনের অবস্থাও নেতিবাচকভাবে ওঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো দেশের মেগাসিটিতে মোট জায়াগার ২৫ ভাগ রাস্তা থাকা আবশ্যক; কিন্তু রাজধানী ঢাকায় রাস্তা আছে মোট ৮ শতাংশ। এই ৮ শতাংশ রাস্তার বিভিন্ন জায়গা সিটি করপোরেশন লিজ দিয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য, যা যানজট সৃষ্টির পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তারা। রাজধানীর সড়কে মৃত্যুর অন্যতম কারণ একাধিক কোম্পানির বাসের বেপরোয়া চলাচল। এ বিষয়টি সরকারিভাবে আরএসটিপি প্রণয়নের সময় জাপানের আন্তর্জাতিক সংস্থা জাইকার গবেষণাতেও উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সর্বশেষ ওই গবেষণা বলছে, ঢাকায় দিনে ২ কোটি ৯০ লাখ যাতায়াত (ট্রিপ) হয়। একজন মানুষ কোনো যানে ওঠে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেমে গেলে একটা ট্রিপ হিসেবে গণ্য করা হয়। মোট ট্রিপের সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ হয় বাস-মিনিবাসে। আরএসটিপিতে বাসের বিশৃঙ্খলার পেছনে মালিকানার ধরন, পরিচালনা ও সড়ক ব্যবস্থায় ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়। এর জন্য বিক্ষিপ্তভাবে বাসের অনুমোদন না দিয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার বাস ছয়টি কোম্পানির অধীনে ছয়টি পথে চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি কোম্পানির বাসের রং থাকবে আলাদা। বিদ্যমান পরিবহন মালিকরা এই কোম্পানিগুলোতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। বিনিয়োগের হার অনুসারে মালিকরা লভ্যাংশ পাবেন। এটা করা হলে পথে বাসের চালকদের মধ্যে পাল্লাপাল্লি করার প্রয়োজন হবে না; কিন্তু ২০১৭ সালে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর প্রক্রিয়াটি থেমে যায়। প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে তিনটি বৈঠক করা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির দুই মেয়রও এ বিষয়ে আর এগোতে পারেনি। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড় ও যানজট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে কেবল কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই তৈরি হচ্ছে যানজট। যেসব এলাকার যানজট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়, এর মধ্যে রয়েছে— বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কলাবাগান, শাহবাগ, আজিমপুর, শ্যামলী, আগারগাঁও, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডা, পল্টন, গুলিস্তান, কাকরাইল, মহাখালী, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর। এসব এলাকা ঘুরে লেন ব্যবস্থা অকার্যকর থাকার ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।

যানজট নিরসনে ঢাকায় বাস্তবায়নাধীন বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একটি রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি) অনুমোদন করে সরকার। যাতে পাঁচটি পাতাল রেললাইন, দুটি দ্রুতগতির বাস রুট এবং ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান সড়ক নেটওয়ার্কের দ্বিগুণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় ছয়টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং তিনটি রিং রোড অন্তর্ভুক্ত আছে। আগামী ২০ বছরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ৩ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে আরএসটিপির অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে এসব চলমান প্রকল্প দেখে অনেক সময় গোলকধাঁধায় পড়েছেন ঢাকাবাসী। কেউ কেউ মনে করছেন, সবই বুঝি মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ। আসলে নানা রুটে নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে ঢাকায়।

ঢাকা মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-৬) রুট বা মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তৃতীয় পর্বে উত্তরা থেকে আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়াল রুট সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে চলতি বছর ডিসেম্বরে। রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (উড়াল সড়ক) নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিপরীতে এয়ারপোর্ট রোডের কাওলা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত সংযোগ সড়কসহ ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এক্সপ্রেসওয়েটি। প্রকল্পের রুটগুলো হচ্ছে— শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-কুড়িল-বনানী-মহাখালী-তেজগাঁও-মগবাজার-কমলাপুর-সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী যেতে সর্বোচ্চ সময় লাগবে ২০ মিনিট। এ দিকে এতগুলো মেগা প্রকল্প থাকার পরও, রাজধানীর যানজট নিরসন নিয়ে এখনো শঙ্কিত সরকার। তাই মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি পাতাল রেল ও ভূগর্ভস্থ পরিবহন ব্যবস্থার (সাবওয়ে) দিকে মনোযোগ দিয়েছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেতু বিভাগের প্রস্তাবিত এই পাতাল রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে ৬৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় হবে।

প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আশা করেন বিশাল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক নির্মাণের পর ঢাকার যান চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে। বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে ভূগর্ভস্থ নির্মাণের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও স্বীকার করেছেন একটি উপযুক্ত পাতাল রেল সড়কে যানজট কমাতে সাহায্য করবে। মাত্র এক কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের খরচ দিয়ে একটি মানসম্পন্ন বাস সার্ভিস নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানান তারা। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকার সড়ক যান চলাচলের ভয়াবহ অবস্থার সমালোচনা করে বলেন, শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে রাজধানীতে পাতাল রেল ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, সরকার বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির পরিবর্তে গতি বাড়াতে বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে। রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা অপরিহার্য। কারণ অনেক দেশেই সাধারণ মানুষ শহরে পাবলিক বাস ব্যবহার করেন এমনকি তাদের পাতাল কিংবা মেট্রো রেল থাকার পরও।

বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি সরকারের উচিত সড়ক ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি করা, কারণ এটি সস্তা। বিবিএর প্রধান প্রকৌশলী ও ঢাকা সাবওয়ের প্রকল্প পরিচালক কাজী মুহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) ঢাকা সাবওয়ের চারটি রুটের প্রাথমিক নকশা সম্পন্ন করেছে। বিবিএ ২০৭০ সালের মধ্যে ১১টি রুটসহ পুরো ঢাকা শহরকে একটি সম্পূর্ণ পাতাল রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষভাবে আহ্বান করা হয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ