ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

মানসিকতার পরিবর্তনে শুভবুদ্ধির উদয় হোক

প্রকাশনার সময়: ২৪ জুলাই ২০২২, ০১:১৭

যেকোন বস্তুর মূল্য নির্ধারণের পর যদি সেই মূল্য সম্পূর্ণ আদায় না করা হয় তবে যতটুকু বাকী থাকলো সেটা নিজ থেকে পরিশোধ করার নামই ভর্তুকি। অর্থাৎ কোন কিছুর যে মূল্য তার চেয়ে কমে পাওয়া বা দেওয়াকে ভর্তুকি বলে। যেটুকু কম দেয়া হয় তা সাধারণত সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নিজে বহন করে। সহজ করে বললে, ধরা যাক বর্তমানে/আজকে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। সরকার ট্যারিফ এবং consumption অনুযায়ী প্রতি khw দশ টাকা (+/-) নিচ্ছে ভোক্তাদের কাছ থেকে কিন্তু সরকার প্রাইভেট কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিশ টাকা করে। এক্ষেত্রে প্রতি khw এ প্রায় ১০ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। যেসকল পণ্য নিত্য প্রয়োজনীয় তার দাম সবার নাগালের মধ্যে রাখতে, আবার যেসকল সেবা অতি জরুরী এবং অভ্যন্তরীণ বা দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কোনো দেশের সরকার বিশেষ পণ্য বা সেবার ওপর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এতে করে পণ্যটির উৎপাদন খরচ বেশ কমে আসে এবং সাধারণ মানুষ তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সহজেই পণ্যটি ব্যবহার করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মূল্যস্ফীতি বা অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এসব নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে অনেক সময় সরকার সেসব পণ্যের ওপর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। যেন সব ধরনের আয়ের মানুষ সেসব পণ্য ব্যবহার ও তার প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারে। কৃষক যাতে স্বল্প মূল্যে সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ পায় সেজন্য প্রতিবছর কৃষিতে বিশাল অংকের ভর্তুকি দেয় সরকার। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন তথা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা দরকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। সরকারকে ২০২১-২২ অর্থবছরে সারের জন্য ভর্তুকি দিতে হয়েছিলো প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। যত বেশি ভর্তুকি দেয়া হবে অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তত বেশি ব্যাহত হবে। অন্যদিকে সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে। এতে করে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং খাদ্যপণ্যের দাম আরো বেড়ে যেতে পারে। গেল ২০২১-২০২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয় ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৭০ শতাংশ। চলমান ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে প্রাথমিক প্রাক্কলনে এবারে এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ধারণা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস, সারের মূল্যের সাম্প্রতিক যে অস্থিরতা তাতে করে ভর্তুকি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। দাতা সংস্থাগুলো বিশেষ করে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি বিভিন্নভাবে সরকারকে চাপ দেয় ভর্তুকি কমানোর জন্য। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, সার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজির দাম যে পর্যায়ে চলে গেছে তাতে দেশে ওইসব পণ্যের দাম যদি না বাড়ানো হয় তবে অর্থবছর শেষে ভর্তুকি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে বিরূপ প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে এবং চাপে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

সরকার মূলত সার, বিদ্যুৎ, গ্যাস এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দেয়। যদি সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা যায় তবে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমবে। দেশে যে সার বা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তার জন্য জ্বালানি হিসেবে প্রয়োজন গ্যাসের। সুতরাং এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গ্যাসের দাম বাড়লে বা এটির সংকট দেখা দিলে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিবে। সাধারণত পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি এলএনজি কিনে। তবে বর্তমানে এলএনজির অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে আমদানি কিছুটা হ্রাস করেছে পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালে যখন স্পট মার্কেট থেকে প্রথম এলএনজি কেনে বাংলাদেশ তখন এক কার্গো এলএনজি কিনতে খরচ হতো ৩০০-৩৫০ কোটি টাকার মতো সেটি বর্তমানে ৩-৪ গুণ বেশি অর্থ খরচ করে কিনতে হচ্ছে। চলমান গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখতে বিকল্প পথে হাঁটতে হচ্ছে। মূলত এ কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে শতভাগ সক্ষমতা অর্জন করার পরও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ফারাক থাকায় প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া লোডশেডিং আবার ফিরে এসেছে। এ অবস্থায় যদি ভর্তুকি কমাতে হয় তবে জ্বালানি আমদানির রাশ টানতে হবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং কমবে শিল্পোৎপাদন। ধারণা করা হচ্ছে তিন মাস পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে পারে। পরবর্তীতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু হলে এবং আমদানিকৃত বিদ্যুৎ এলে পরিস্থিতি আবার সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। সংকট সমাধানে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধকরণ, দোকানপাট-মার্কেট রাত ৮.০০ টার পর বন্ধ রাখা, বিদ্যুৎ ব্যবহারে যথাসম্ভব মিতব্যয়ী হওয়া, এলাকাভিত্তিক দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং, ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন আপাতত স্থগিত, সপ্তাহে এক দিন পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখা, সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, অনলাইনে অফিস করার পরিকল্পনাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা এসেছে সরকারের তরফ থেকে। আপদকালীন এসব উদ্যোগ সংকট সমাধানে কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রতিদিন প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় করে থাকি। যে বিদ্যুৎ আমি বা আমরা অপচয় করছি হয়তো সে বিদ্যুতই অন্যের ঘরে আলো জ্বালাতে ব্যবহৃত হতে পারতো। বিদ্যুৎ অপচয় রোধে যা করা যেতে পারে:

>বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক পণ্য যেমন- ওভেন, ফ্যান, হিটার, পিসি ইত্যাদি প্রয়োজন ব্যতীত বন্ধ রাখা।

>ওয়াশিং মেশিনকে বলা হয় ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’; এটি ব্যবহারে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হয়। তাই সম্ভব হলে এটি ব্যবহার না করাই ভালো বা অতি প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার না করাই উত্তম।

>ফ্যান ব্যবহার করে কাপড় শুকানোর পরিবর্তে ছাদে বা বারান্দায় মেলে দেয়া যেতে পারে।

>বৈদ্যুতিক পাখায় ইলেক্ট্রনিক রেগুলেটর ব্যবহার করা।

>হিটার/গিজার ব্যবহার করে পানি গরম করার অভ্যাস পরিত্যাগ করা।

>হেয়ার ড্রায়ারের ব্যবহার কমানো।

>দিনের আলোয় অকারণে বাতি জ্বালানো যাবে না।

>বিভিন্ন উৎসব কিংবা অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা না করা।

>মাইক্রোওয়েভ, রাইস কুকার, কারি কুকার ইত্যাদি একেবারেই বাধ্য না হলে ব্যবহার না করা।

>বাড়িতে আয়রন করার পরিবর্তে দোকানে করা যেতে পারে।

>প্লাগে অকারণে চার্জার লাগিয়ে রাখলেও বিদ্যুতের অপচয় হয়।

>হ্যালোজেন বাল্বের পরিবর্তে এনার্জি সেভার বাল্ব ব্যবহার করা, এটি বিদ্যুৎ অপচয় ও খরচ দুই-ই কমায়।

>রাস্তাঘাটে যেসব সড়কবাতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেগুলো সময়মত বন্ধ করা।

>সিস্টেম লস কমিয়ে আনা। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগগুলো শনাক্ত করে তা বিচ্ছিন্ন করা ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং সেসব স্থানে মিটার স্থাপন করা। কোন গ্রাহককে যখন মিটার প্রদান করা হবে তখন লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ত্রুটিবিহীন মিটার সংযোগ দেয়া হয়। এছাড়া ১০০% প্রিপেইড মিটারিং সিস্টেম চালু করা, উন্নত ধরনের ইন্সুলেটেড ক্যাবল ব্যবহার করা।

উৎপাদনশীল প্রতিটি সেক্টর বিদ্যুতের সাথে জড়িত। বিদ্যুতের ঘাটতি হলে সেটি উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যেটি দৃশ্যমান হবে বাজারে। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমাদের সকলের আরো বেশি সাশ্রয়ী হতে হবে।

ভর্তুকির বিষয় নিয়ে যদি বলতে হয় তবে এটি বলা যায় যে, এখনো ভর্তুকি পরিহার করার মতো অবস্থায় যায়নি আমাদের অর্থনীতি। যতই ভর্তুকি কমানোর বা বাতিলের দাবিই উঠুক না কেন; সরকার যখনই ভর্তুকি কমাতে যায় তখনই দেখা দেয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। বেশ কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ভর্তুকি না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়। যার প্রভাব পড়ে বাস ভাড়ায় ও নিত্যপণ্যের বাজারে। একপক্ষ বলছে ভর্তুকি কমাও তো আরেকপক্ষ দাবি তুলছে ভর্তুকি বাড়াও! সুতরাং প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বে তার পিছনের অবস্থাটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার। এতে করে অনেককিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে। যত দ্রুত আমাদের এ শুভবুদ্ধির উদয় হবে ততই তা আমাদের জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠবে। লেখক:

শিবু দাশ সুমিত, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, নড়াইল।

নয়া শতাব্দী/এমএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ