ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

চা উৎপাদনের ঊর্ধ্বমুখিতার পেছনের গল্প

প্রকাশনার সময়: ১৫ জুলাই ২০২২, ১৫:০৮

অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করে বাংলাদেশ চা শিল্প ২০২১ সালে সর্বোচ্চ পরিমাণ চা উৎপাদন করে। গত বছর ৯৬ দশমিক ৫০৬ মিলিয়ন কেজি চা উৎপন্ন হয়েছে। এটি চা বোর্ডের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। তবে গত বছর (২০২১) অন্য সব ভ্যালিতে চা উৎপাদন ২০২০ সালের চেয়ে বেশি হলেও চট্টগ্রাম ভ্যালির ২৩টি বাগানে ৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় কম। ২০২১ সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রাম ভ্যালির ৩৫ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৩৯ একর আয়তনের ২৩টি চা বাগানে তুলনামূলক কম চা উৎপাদন হয়েছে। চট্টগ্রাম ভ্যালিতে ২০১৯ সালে চা উৎপাদন হয়েছিল ১১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন, ২০২০ সালে ১১ দশমিক ২৩ মিলিয়ন এবং ২০২১ সালে ৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন কেজি।

চা শিল্পের গোড়ার দিকে তাকালে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ডের মধ্যে চট্টগ্রামেই প্রথম চা চাষের সূচনা। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন কালেক্টর মি. স্কোনস আসাম থেকে চায়ের বীজ এবং কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চায়না চারা সংগ্রহ করে চা বাগান গড়ে তোলেন। ১৬১ বছর আগে শুরু হওয়া চট্টগ্রাম ভ্যালিতে চা উৎপাদন কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে চা বোর্ড।

চা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিলম্বিত বৃষ্টিপাত, খরা, দুর্বল সেচ ব্যবস্থাপনা ও প্রুনিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং পোকামাকড়ের আক্রমণের ফলে চট্টগ্রাম ভ্যালিতে চা উৎপাদন নিম্নমুখী হওয়ার প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম ভ্যালির বাগানগুলোয় ২০২১ সালে তুলনামূলক কম চা উৎপাদন হওয়ার কারণ পর্যালোচনা এবং এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চা বোর্ড বেশকিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাগান ব্যবস্থাপকদের নিয়ে বাংলাদেশ চা বোর্ড একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভা করেছে। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী এবং প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের বিশেষজ্ঞরাও ওই সভায় সংযুক্ত ছিলেন।

সভায় বিশেষজ্ঞরা চট্টগ্রাম ভ্যালির চা বাগানগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে অর্গানিক সারের ব্যবহার বাড়ানো, সঠিক প্রুনিংসাইকেল অনুসরণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রোগবালাই দমনসহ সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং এর আওতাধীন বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটউট ও প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট দেশের সব বাগানকে নিয়মিত বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে আসছে। চট্টগ্রাম ভ্যালির বাগানগুলোয় চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সেবার মান বৃদ্ধি এবং সেবা প্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে চা বোর্ড বিটিআরআই ফটিকছড়ি উপকেন্দ্রে আধুনিক মৃত্তিকা বিশ্লেষণ গবেষণাগার স্থাপন করে। এ গবেষণাগারকে অধিকতর কার্যকর করতে ২০২১ সালের নভেম্বরে একজন সার্বক্ষণিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (মৃত্তিকা বিজ্ঞান) নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ চা বোর্ড। আগে মাটি ও সারের নমুনা বিশ্লেষণ, সারের মাত্রা নির্ণয়পূর্বক সুপারিশমালা প্রণয়নের নিমিত্তে মাটির নমুনা বিটিআরআই, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজারে পাঠানো হতো। এতে সময় লাগত পাঁচ-সাতদিন (কুরিয়ার প্রাপ্তি-প্রেরণ)। কিন্তু মৃত্তিকা বিশ্লেষণ গবেষণাগার স্থাপনের ফলে মাটি ও সারের গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে দ্রুততার সঙ্গে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এখন মাত্র ৫ ঘণ্টায় সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। এতে সেবার গতি বহুগুণ বাড়ে। একই সঙ্গে অর্থও সাশ্রয় হচ্ছে। আগে মাটির নমুনা পাঠানো হতো শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার। এখন ফটিকছড়ি উপকেন্দ্রেই মৃত্তিকা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এতে চায়ের কারিগরি সেবা এখন হাতের নাগালে। সার ও মৃত্তিকা বিশ্লেষণের পাশাপাশি ফটিকছড়ি উপকেন্দ্রে একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব) সার্বক্ষণিক চা বাগানের রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় সব সেবা দিচ্ছেন।

উপকেন্দ্রের এ কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সেবা দিচ্ছেন। এ গ্রুপে যুক্ত আছেন ভ্যালির বিভিন্ন বাগানের ব্যবস্থাপক। যেকোনো রোগের লক্ষণ বা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়া মাত্রই তার ছবি তুলে গ্রুপে দিচ্ছেন বাগান কর্তৃপক্ষ। সে ছবি দেখে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মশিউর রহমান আকন্দ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের এসব উদ্যোগে চট্টগ্রাম ভ্যালির চা আবাদের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে এসেছে স্বস্তি। এ বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টিপাত হয়েছে। আশাও করা হচ্ছিল এ বছর চায়ের উৎপাদন ভালো হবে। সে আশা বাস্তবে রূপ পাওয়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসের (জানুয়ারি-মে) উৎপাদন আশা জাগাচ্ছে। গত বছর (২০২১) মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম ভ্যালিতে মোট উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার ১৭০ কেজি। এ বছর একই সময়ে এখন পর্যন্ত মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩১ হাজার ৬১০ কেজি। গত বছরের চেয়ে এ বছরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৬ শতাংশ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এগিয়ে যাবে দেশের চা শিল্প এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

চা শিল্প দেশের অন্যতম একটি সম্ভাবনাময় খাত। প্রতিনিয়তই এ শিল্পের পরিবর্তন হচ্ছে। হচ্ছে সম্প্রসারণ, বাড়ছে উৎপাদন। উৎপাদনে বাড়ছে চা বাগান। চা সেবায় যোগ হচ্ছে ডিজিটাল কার্যক্রম। বাড়ছে বিনিয়োগ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় নেয়া হচ্ছে নতুন উদ্যোগ। সমতলেও হচ্ছে চা উৎপাদন। রফতানি হচ্ছে বিশ্বের ২৩টি দেশে। চা শিল্পে সম্ভাবনার হাতছানি ক্রমেই বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে চট্টগ্রাম ভ্যালির সম্ভাবনাও। বাংলাদেশ চা বোর্ডের সময়োপযোগী উদ্যোগ ও অনুকূল আবহাওয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে চট্টগ্রাম ভ্যালির তথা সমগ্র চা শিল্পের।

লেখক : সচিব, বাংলাদেশ চা বোর্ড।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ