ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ফেলে আসা ঘুড়ির গোধূলি 

প্রকাশনার সময়: ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১৩:০৪

সূর্যের শেষ আলোয় কিছুটা মায়া লেগে আছে পৃথিবীর শরীরে। মায়ার নদী মুখ লুকোতে ব্যস্ত সন্ধ্যার আঁচলে। এই তো, সূর্য ডোবার পালা শুরু হচ্ছে। পায়ে পায়ে হেঁটে সন্ধ্যার স্টেশনে পৌঁছাই। নরসিংদী নগরীর কোলাহলমুখর পাড়া। যেখানে মানুষ কোথাও যাবার তাড়া নিয়ে অপেক্ষা করে। কিছু মানুষ মন্থর বসে থাকে প্ল্যাটফর্মের আসনে। থেমে থেমে চলে ফেরিওলার দাপাদাপি। কলির হাকডাক। পথশিশুর হৈ-হুল্লড় আর কচি হাতের প্রার্থনা।

মায়াবী সন্ধ্যার এই সময়ে স্টেশন পাটাতনে ঘুরে বেড়ায় স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। শরীর চর্চায় দ্রুত হেঁটে যায় বয়সের দিকে বাড়ন্ত মানুষ। প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে সামান্য পশ্চিমে দুই রেল লাইনের মধ্যের সবুজ ঘাসে বসি। নরম তুলতুলে ঘাসের ডকা, পেট ও পিঠ। স্টেশনে এলে এখানেই আসন পাতি। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, আড্ডা, গান হয়। মাথায় ঝিম ধরিয়ে লম্বা হুইসেল দিয়ে ট্রেন আসে, যায়। ট্রেনের ঝনঝন শব্দের সঙ্গে আমাদের কথা মিলিয়ে যায়। শূন্যে ভেসে বেড়ায় নানা অভিলাষ।

ফিকে আকাশ। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ উড়ছে গগনে। অলস গতিতে হালকা বাতাস বইছে। তাকিয়ে থাকি শূন্যে। দেখি নানা রঙের কাগজের পাখি মনভালো করা গতিতে উড়ছে। হাওয়ায় দুলছে। প্রকৃতির বিহঙ্গদের সঙ্গে কানামাছি খেলছে।

আহ্ ঘুড়ি! আকাশে ঘুরে বেড়ানো ঘুড়ি! কেমন আছ তুমি, তোমরা? আমার ছেলেবেলার আকাশে উড়তে থাকা ঘুড়িরা আজ কোথায়?

সবুজের ওপর বসে থেকে এই শহর ছেড়ে চলে যায় স্মৃতির শহরে। মায়াবতী মেঘনা নদী পার হয়ে গ্রামে। হাফপ্যান্ট পরে ঘুরতে থাকি জন্মশহরে; সবুজের বনভূমিতে প্রকৃতির নির্মল হাওয়া গায়ে মেখে। মেঘনার জলের কল্লোল কানে বাজিয়ে।

সেখানে আমার ছিল এক উদার আকাশ। হরিৎ ঘাসে বিছানো বিস্তৃত সবুজ জমিন। ছিল ভাইয়ার হাতে যত্নে বানানো নাটাই আর ঘুড়ি। লেজওয়ালা। কাগজের ঘুড়ি।

এমনই পড়ন্ত বেলায় ঘুড়ি নিয়ে চলে যেতাম মাঠে। হাওয়ার সঙ্গে মিতালি করে উড়াতাম। হাওয়াকে নানান কথায় লোভ দেখাতাম। ঘুড়ি উড়ত আকাশে। উড়তে উড়তে গগনকে ছুঁয়ে দেবার বাসনায় উদগ্রীব হয়ে পড়ত। কখনো ব্যর্থ হয়ে ভেজা শরীরে ফিরে আসত। কান্নার পানিতে ভিজে ভারি হয়ে যেত কাগজের শরীর।

মৌল হুসেন দাদার সন্ধ্যা-আজানের মধুর ধ্বনি শুনে ঘুড়ি নিয়ে ফিরতাম বাড়ি। বসতাম পড়ার টেবিলে। অপেক্ষায় থাকতাম কখন আবার এমন একটি বিকেল আসবে।

মনে পড়ে, একবার খুব শখ করে বড় আকারের একটি ঘুড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন বড় ভাই। সেদিন আমার খুশির ঝিলিক দেখে কে! খুশিতে আটখানা। কড়া রোদেই চলে গেলাম মাঠে। শূন্যে উড়ালাম ঘুড়ি। শখের ঘুড়ি নাচছে ইথারে। ইথারে ভাসছে আনন্দ ও ভালোবাসার গান। দূর আকাশে উড়ছে ঘুড়ি। চোখে দেখা যায় না। কী যে আনন্দ!

হঠাৎ কেঁপে ওঠে মন। থমকে যায় চলমান হাত। হাত অনুভব করতে পারছে না প্রিয় ঘুড়ির স্পর্শ। দিশেহারা মনে বিমর্ষ চেহারায় সুতো টানি। না, ঘুড়ি দেখা যায় না। অবশেষে শেষ সুতো ফিরে এল মুকুটহীন। ঘুড়ি চলে গেছে দূরে। অজনায়। উড়ছে বাতাসে, আকাশে। কেঁদে কেঁদে হয়রান আমি। জলভরা চোখে বাড়ি ফেরি।

আজ পৃথিবীর এই শহরে, নরসিংদীর রেল স্টেশন ছাড়িয়ে অদূরে বসে দেখছি আকাশে দোলায়িত ঘুড়ি। নানা রঙের। দিব্বি ইচ্ছে করছে, ফিরে যেতে সেই হারানো শৈশবে। ঘুড়ি-নাটাইয়ের গ্রামে। নির্মল শান্ত আকাশের সামিয়ানায়। বসে থাকতে নরম ঘাসে ঘাসে। আমি হাত বাড়াই অধরায়।

নয়া শতাব্দী/আরআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ