রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

কেন এই বিপর্যয়

প্রকাশনার সময়: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৮:১৭

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের অধিকাংশ এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৫ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পরেই জানা যায়, জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলে (যমুনা নদীর এপার) বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ফলে একযোগে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে এই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, অফিস-আদালত ও হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা বিঘ্নিত হওয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে।

হঠাৎ কেন ঘটল এমন বিপর্যয়? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি, জানানো হয়নি বিপর্যয়ের কারণও। বিপর্যয়ের পর সব স্বাভাবিক হতে কেনই বা এত সময় লেগেছে, এটিরও কোনো কারণ জানা যায়নি। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনায় গঠন করা হয়েছে দুটি তদন্ত কমিটি।

গুঞ্জন রয়েছে সম্প্রতি দেশে নানাবিধ ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান হচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এসব ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রও দৃশ্যমান হচ্ছে। আর জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, কেন এমন বিপর্যয় ঘটল, এর মূল কারণ কী বা এর জন্য কারা দায়ী সেটি খুঁজে বের করা দরকার। হঠাৎ এমন বিদ্যুৎ বিপর্যয় এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ কিনা সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।

এদিকে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের ফলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মধ্যে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে বিদ্যুৎহীনতা দেখা দেয়ার অন্তত ৬ ঘণ্টা পর রাজধানীর উত্তরা, টঙ্গী, বিমানবন্দর, মিরপুর ডিওএইচএস, জিগাতলা, ধানমন্ডিসহ রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরেছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কাউসার আমীর আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে দেশের মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। জাতীয় গ্রিডের অপারেশনাল বডি, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সঙ্গে আমরা বিষয়টি সমাধানে সমন্বয় করছি।’

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পরিচালক বিকাশ দেওয়ান জানান, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করা গেছে।

পিডিবির চার নং ডিভিশনের বিক্রয় ও বিতরণবিষয়ক ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে, বেলা দুইটার পর থেকে জাতীয় গ্রিডে নিম্ন প্রবাহের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়।

ফেসবুক পোস্টটি জানায়, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে যথেষ্ট সময় লাগবে। সরবরাহ ফেরাতে নিরলস কাজ করছেন জাতীয় গ্রিড ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীরা। যোগাযোগ করা হলে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)’র দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলে বিভ্রাটের কারণে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও কুমিল্লায় সম্পূর্ণ ব্লাকআউটের মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। তবে এর পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।

রেজাউল করিম বলেন, সংযোগ ফেরাতে পিডিবির দক্ষিণাঞ্চলের সব ইউনিট কাজ করছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে জানানো হয়, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা— ডেসকোর আওতাধীন এলাকাসমূহে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ ফেরানো হচ্ছে। মিরপুর, এয়ারপোর্ট, গুলশান, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকা এবং টঙ্গীতে গত রাত সাড়ে ৭টার দিকে আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০৮ মেগাওয়াট লোড পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে হাসপাতাল এবং জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

এদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) মুখপাত্র বজিউজ্জামান সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির বলেন, ‘জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে পুরো বিভাগে বিদ্যুৎ নেই। দেশের ৫ বিভাগই বিদ্যুৎহীন। সব বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন বন্ধ। কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা বলা যাচ্ছে না। তবে সময় লাগবে।’

সিলেট বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩-এর ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, দুপুর ২টা ২ মিনিটে আন্ডার ফ্রিকোয়েন্সির কারণে ব্ল্যাক-আউট হয়েছে। এ কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুতের এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করে যাচ্ছেন জাতীয় গ্রিড ও পাওয়ার প্লান্টের কর্মীরা। তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঠিক কারণ সম্পর্কে এখনও কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। অনাকাঙ্ক্ষিত এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্যধারণ করতে বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে সারাদেশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। টানা ১২ ঘণ্টা পুরো দেশে বিদ্যুৎ ছিল না।

জনজীবনে হাঁসফাঁস : টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ ছিল না রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের একটি বড় অংশজুড়ে। মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে এই বিপর্যয় ঘটে বলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা যায়। বিদ্যুতের পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিড ফেল করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় ভ্যাপসা গরমে জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা বিরাজ করে। স্বস্তি পেতে কেউ বাসার ছাদে কেউ আবার বাসার নিচে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করেন। এছাড়াও এসব এলাকার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়।

দুপুর দুইটায় যখন বিদ্যুৎ যায় তখন অফিস কার্যক্রম চলছিল। যেসব অফিসে জেনারেটর নেই এমন অফিসে এক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকটাই গরমে হাঁপিয়ে ওঠেন। অফিস শেষে বাসায় এসেও বিদ্যুৎ না পেয়ে অনেকের মধ্যে বিরক্তি দেখা যায়।

এদিকে, কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না আসায় রাজধানীর বিভিন্ন ভবনসহ বিভিন্ন অফিস দোকান যেখানে জেনারেটর লাগানো আছে তারা ছুটেছেন পেট্রোল পাম্পে। রাজধানীর অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে ৪টার পর থেকেই লম্বা লাইনের ভিড় দেখা যায়।

স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে : রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর বিদ্যুৎ আসে। তবে জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয় কাটাতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

একটি সঞ্চালন লাইনে বিভ্রাট দেখা দেয়ায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ আসে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বিদ্যুৎ আসার খবর পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার সাতটার দিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে দ্রুত বিদ্যুৎ রিস্টোর হচ্ছে। ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মানিকগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জের আংশিক এলাকায় সরবরাহ চালু হয়েছে। ঢাকায় লোড বেশি হওয়ার কারণে সব লাইন সচল করতে কিছুটা দেরি হতে পারে। অনাকাঙ্ক্ষিত অসুবিধার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, আকস্মিকভাবে আজ (গতকাল) দুপুর ২টা ৫ মিনিটে জাতীয় গ্রিডের ইস্টার্ন অংশে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ) সমস্যা দেখা দেয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ সেবা স্বাভাবিক হবে জানিয়ে সংস্থাটি বলছে, এখনও এই বিপর্যয়ের কারণ জানা যায়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

আরও জানানো হয় দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-সহ বিদ্যুৎ খাতের সব সংস্থা একযোগে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পিডিপির উপপরিচালক মোহাম্মদ শামীম হাসান বলেন, জাতীয় গ্রিডে কিছু সমস্যার কারণে দেশের অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমাদের টিম সব জায়গায় কাজ করছে। সবকিছু ঠিকঠাক হতে তিন-চার ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। আমরা দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।

একটি সঞ্চালন লাইনে বিভ্রাট দেখা দেয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহসহ দেশের অধিকাংশ এলাকা একযোগে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ