রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

খেলা মাঠে জুয়া সবখানে!

প্রকাশনার সময়: ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১০:৩৮

এসময়ে সবচেয়ে আলোচিত অনলাইন জুয়া। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে সু-কৌশলে অনলাইন জুয়ার (বেটিং) মাধ্যমে চলছে এ খেলা। খেলা মাঠে কিংবা দেশ-বিদেশে চললেও বাজি চলছে অনলাইনে। বিপিএল, আইপিএলসহ সবধরনের খেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে অনলাইন জুয়া চক্র। জুয়াড়িরা হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে দেশের বাইরে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন জুয়া এবং মানি লন্ডারিংসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধীদের শনাক্ত, ডিজিটাল সাক্ষ্য সংগ্রহ, মামলার তদন্ত পরিচালনা, পারিবারিক এবং সামাজিক সচেতনতাসহ যাবতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

মে ২৪, ২০২২। নরসিংদীর বেলাবো উপজেলায় জুয়া খেলে ঋণগ্রস্ত হয়ে গভীর রাতে জুয়ায় আসক্ত গিয়াস উদ্দিন শেখ তার ঘুমন্ত স্ত্রী রহিমা বেগমকে ক্রিকেট খেলার ব্যাট দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে এবং স্ত্রী-সন্তানদের গলা কেটে হত্যা করে। নরসিংদীর পিবিআই পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, গিয়াস উদ্দিন জুয়া খেলে অনেক টাকা হেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তার স্ত্রী রহিমা বেগমের নামে ব্র্যাক, আশাসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ নেয়। এগুলো থেকে মুক্তি পেতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে স্বীকার করে।

অনলাইন জুয়া ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ও এসব অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে গতকাল রোববার সিআইডির সদর দফতরে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে পুলিশপ্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অনলাইন জুয়া ও মানি লন্ডারিংসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

একই অনুষ্ঠানে এসবিপ্রধান মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নানা ধরনের অপরাধ করছে। এই অপরাধগুলো কঠোরভাবে দমন করা হবে। মনিরুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়া এবং মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে সিআইডি গুরুত্বপূপর্ণ ভূমিকা পালন করছে ও এসব অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে।

অনুসন্ধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত www.mazapbu.com ও www.betbuzz365.live নামের বেটিং ওয়েবসাইটের সুপার এজেন্টরা বাংলাদেশে নিয়োগ করে মাস্টার এজেন্ট। সুপার এজেন্টরা প্রতিটি পিবিইউ (ভার্চুয়াল কারেন্সি) ৬০ টাকায় বিক্রি করে।

আর দেশীয় মাস্টার এজেন্টরা লোকাল এজেন্টদের কাছে তা বিক্রি করে ১০০ টাকায়। ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় নিয়োগ করা হয় লোকাল এজেন্ট। তারা আবার লোকাল জুয়াড়িদের কাছে পিবিইউ বিক্রি করে দেড় শ’ টাকায়।

সরেজমিন রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাব, অফিস, হোটেল, বাসায়, মার্কেটে, চা দোকান ও সেলুনে চলে এই জুয়ার আসর। এতে যেমন চক্রটি লাভবান হচ্ছে তেমনই নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার। বাজি ধরা হচ্ছে টেলিভিশন, ফেসবুক ও মোবাইলের মাধ্যমে। এখানে বাজির দুই পক্ষ ছাড়াও রয়েছে মধ্যস্থতাকারী।

প্রতিষ্ঠানের মালিক জুয়াড়িদের কাছ থেকে ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ নিচ্ছেন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ টাকা। জুয়ায় উৎসাহ দেয়া লোকজন মূলত এজেন্ট। মেহেদী হাসান নামের একজন অনলাইন জুয়াড়ি নয়া শতাব্দীকে বলেন, তুরাগের বাউনিয়া এলাকায় আমার একটি সেলুন ছিল। সেখানে আইপিএল, বিপিএল এমনকি বিদেশি বিভিন্ন ক্লাবের খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরতাম। এই জুয়ায় পড়ে আমি নিঃস্ব এখন। শেষ পর্যন্ত জুয়ার টাকা পরিশোধ করতে না পেরে দোকান বিক্রি করে এখন পলাতক।

সরেজমিন দেখা গেছে, জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন পেশার মানুষ। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা ক্লাব, বার ও পাঁচতারকা হোটেলে। অন্যদিকে চা দোকানের জুয়াড়িরা হলো— রিকশাচালক থেকে শুরু করে শ্রমিক, স্থানীয় দোকানদার শ্রেণির। সূত্র বলছে, সম্প্রতি পুলিশি তৎপরতা, ক্রীড়াঙ্গনে ক্যাসিনো বন্ধ হলেও বিভিন্ন স্থানে জায়ান্ট স্ক্রিন বসিয়ে, দোকান ও ক্লাবে টিভিতে চলা খেলাকে কেন্দ্র করে চলছে অনলাইন বেটিংয়ের আয়োজন। জুয়াড়িদের তথ্যমতে, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে খেলা হয় জুয়া। জুয়া খেলার জন্য আছে অনেক ওয়েবসাইট। এসব ওয়েবসাইটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে বেট ৩৬৫বিডি, ওয়ানএক্সবেট, টাকা ০৭, লাক ৭৫, টাকা ১০০, দুবাই ক্লাব। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই সাইটগুলোতে প্রতি ম্যাচেই লেনদেন হয়েছে কোটি টাকার বেশি। এছাড়া জুয়া হয় মোস্টবেট, বাইবেট, বিডিবেট ১০, স্কাইফেয়ার, গেমঅনসেভেন, বেটনাও ২৪, বেটিন ১০০, স্কোর ৬৬, বেটিন ২০, ৬ এনবিডি, বেটফাস্ট ৩৬৫সহ অনেক সাইটে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অ্যাডমিন নয়া শতাব্দীকে বলেন, আমাদের যারা সাইটগুলোর অ্যাডমিন প্যানেলের দায়িত্বে রয়েছি তাদের সবার জন্য এরিয়া ভাগ করে দেয়া আছে।

অ্যাডমিনরা বলছেন, নিজেরাই সরাসরি এজেন্ট এবং নগদ, রকেট, বিকাশের মতো জুয়াড়িদের নিয়ন্ত্রণে পার্সোনাল এজেন্ট দেয় যাদের কাছ থেকে জুয়াড়িদের বাজি ধরার টাকা ঢোকাতে হয়। জুয়ায় জুয়াড়িরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রাতারাতি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এজেন্ট ও মধ্যস্ততাকারীরা।

অনলাইনে জুয়ায় টাকা আদান-প্রদান হয় যেভাবে: ওয়েবসাইটগুলোর নিজস্ব একাধিক বিকাশ, রকেট ও নগদ নম্বর দেয়া আছে। সেখানে টাকা পাঠালে পাওয়া যাবে সমপরিমাণ কয়েন। জুয়ার জন্য প্রয়োজন সর্বনিম্ন ২০ কয়েন। জেতার পর টাকা তুলতে ‘উইথড্র’ অপশনে গিয়ে অনুরোধ পাঠালে নগদ, বিকাশ বা রকেট নম্বর দিলে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয় লাভের টাকা। কয়েন বিক্রির পর বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় অনেক ওয়েবসাইট পরিচালক। তারপরও জুয়াড়িরা এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

কয়েক ভুক্তভোগী জুয়াড়ি জানান, ‘উইনার ডটকম ও পেড পাওয়ার ডটকমে কয়েন কিনেছিলাম। শুরুতে ওরা দ্রুত টাকা দিয়ে দিত। যখন আমাদের জমানো টাকা লাখের ঘর পার হয়ে যায় নিতে গিয়ে দেখি দুটি সাইটই বন্ধ। এভাবে কোনো কোনো জুয়াড়ির লাখ লাখ টাকা মেরে দিয়ে চলে গেছে। জুয়ার টাকা হওয়াতে থানা পুলিশের অভিযোগও করতে পারছেন না তারা। এভাবে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। অভিজ্ঞ ও পেশাদার ক্রিকেট জুয়াড়িরা জানান, ক্রিকেট জুয়ার ক্ষেত্রে লেনদেনের জন্য রয়েছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মাস্টারকার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড।

রয়েছে বিভিন্ন দেশের অনলাইনভিত্তিক কার্ড ও ক্রিপ্টোকারেন্সি। অনেকে বিটকয়েন, ইথিরিয়াম, ইউএসডিটি নামের ডিজিটাল মুদ্রা কেনাবেচা করেন। বিটকয়েনের কারবার করা হয় বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে। ‘স্ট্রিমকার’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে পাচার হয় জুয়ার টাকা। এতে বিন্স ও জেমসসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ক্রিকেটের বাজিতে অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন হয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, অনলাইন ব্যাংকিং আর হুন্ডির মাধ্যমে বছরে শত শত কোটি টাকার বেশি পাচার হয়ে যাচ্ছে।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ