রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

পুলিশের ‘মাথাব্যথা’ চুরি

প্রকাশনার সময়: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫০

রাজধানীতে কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না চুরির ঘটনা। কখনো বাসার গ্রিল কেটে চুরি, পার্কিং অবস্থায় গাড়ি ও সিঁদেল চুরিসহ অভিনব কায়দায় চুরির ঘটনা ঘটছেই। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ আসামিই থেকে যাচ্ছে ধরা- ছোঁয়ার বাইরে। ফলে তারাই আবার নতুন করে অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলায় অনীহা ভুক্তভোগীদের। তারপরও পুলিশের পরিসংখ্যানে গত ৮ মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১০৮০টি চুরির মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ দুই মাসে চুরির ঘটনা ঘটে ২৬৪টি। এমন পরিস্থিতিতে চুরিরোধে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে ডিএমপির সব ইউনিট।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব মন্দার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়ে চুরির পথে নেমেছে। আবার অনেকের পেশাই চুরি। এ ছাড়া বিপথে গিয়েও অনেকে চুরিসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছেন। এ কারণে কর্মস্থান তৈরির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জামিনে বেরিয়ে তারাই আবার নতুন অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। এ কারণে আমরা চোরদের একটা ডেটাবেজ তৈরি করছি। সেখানে তাদের মুভমেন্ট নজরদারিতে রয়েছে। জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ৫টি চুরির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশের সব ইউনিট। বিশেষ করে বাসায় গ্রিল কেটে চুরির ঘটনাগুলো এখন গোয়েন্দাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ তৈরি করেছে। চোরের হাত থেকে রেহাই পায়নি সাবেক অতিরিক্ত আইজিপির বাসাও। গত ২৩ আগস্ট রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি খন্দকার মোজাম্মেল হকের বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা জানালার গ্রিল কেটে ঘরে প্রবেশ করে একটি লকার নিয়ে যায়। ওই লকারটিতে ৪০-৪৫ ভরি স্বর্ণের গহনা ও ৪০০ সিঙ্গাপুরের ডলার ছিল। খবর পেয়ে সিআইডি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও স্থানীয় পুলিশ বাসায় এসে আলামত সংগ্রহ করলেও আসামিরা এখনও অধরা। পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে ১৯ হাজার ৯৪৫টি মামলা দায়ের হয়েছে। এরমধ্যে চুরির মামলা হয়েছে ১০৮০টি। চুরির মামলাগুলোর মধ্যে সিঁধেল চুরির ঘটনাই ৫শ’টি। গাড়ি চুরির ঘটনা আছে ৭১টি। বাকিগুলো অন্যান্য চুরি। বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে ওয়ারী বিভাগে। আর কম চুরির ঘটনা রয়েছে তেজগাঁও ও মতিঝিল এলাকায়। কম চুরির ঘটনা রয়েছে উত্তরা ও লালবাগ জোনে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নয়া শতাব্দীকে বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চুরির ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি হিসাবে নেয়া হয়। এরপর সেগুলো তদন্ত শেষে আসামি গ্রেফতার ও মালামাল উদ্ধার হলে তখন চুরির মামলা রেকর্ড করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে মালামাল কম খোয়া যাওয়ার কারণে বাদীও মামলা করতে রাজি হয় না। এ কারণে সবকিছু পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা সঠিক হবে না। ডিএমপির অপরাধ বিবরণী থেকে জানা যায়, গত জুলাই মাসে রাজধানীতে মোট ১৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চারটি খুন হয়েছে মিরপুর বিভাগে। ওই মাসে লালবাগ বিভাগে কোনো খুনের ঘটনা ঘটেনি। এ ছাড়া রমনা, ওয়ারী ও গুলশান বিভাগে দুইটি করে এবং মতিঝিল, তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে একটি করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ওই মাসে ডিএমপিতে চারটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে দুইটি এবং মতিঝিল ও মিরপুর বিভাগে একটি করে মামলা হয়েছে। একই মাসে ১৩ দস্যুতার ঘটনার মধ্যে মিরপুর বিভাগেই ঘটেছে চারটি। দ্রুত বিচার আইনে দায়ের হওয়া ৪২টি মামলার মধ্যে ১১টি মামলা হয়েছে তেজগাঁও বিভাগে। এ সংক্রান্ত সবচেয়ে কম একটি মামলা হয়েছে লালবাগ বিভাগে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া শতাব্দীকে বলেন, বেশির ভাগ চুরির ঘটনাই ঘটছে রাত ৩টা থেকে ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত সময়ে। এ সময়টাতে অনেক সময় নৈশপ্রহরীরা একটু ঝিমিয়ে পড়েন। আবার ডিউটিরত পুলিশ সদস্যদের মাঝেই তদ্রাভাব আসে। এই সুযোগে চোরেরা বাসার গ্রিল কেটে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ওই সময়টাতে পুলিশের পেট্রোল ডিউটিকে আরও তৎপর হতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নাইট রাউন্ডে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদেরও ওয়ারলেস সেটে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ জোনের ডিসি মশিউর রহমান নয়া শতাব্দীকে বলেন, ঢাকায় ফেরিওয়ালা সেজে দিনের বেলায় সংঘবদ্ধ চোর চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন বাসা রেকি করে। এরপর তারা তাদের উস্তাদকে বিস্তারিত জানানোর পর চুরির কৌশল নির্ধারণ করে। এরপর সুযোগ বুঝে তারা রাতের যেকোনো সময়ে চুরি করে। এ ছাড়া আরও একটি গ্রুপ রয়েছে যারা দিনের বেলায় চুরি করতে পারদর্শী। তারা স্কুলগামী পরিবারকে টার্গেট করে। বাচ্চাদের মায়েরা কোন সময় সন্তানদের স্কুলে আনা নেয়া করছে সে সময়টাকে বেছে নেয়। এরপর সুযোগ বুঝে চুরি করে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই চোরদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক ইউনিট।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে তুরাগ, উত্তরা পশ্চিম ও বনানী থানার ৩টি ঘটনার মামলা তদন্ত করতে গিয়ে মো. নজরুল ইসলাম সোহাগ ও জুয়েল নামের দুই চোরকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারের পর তারা ঢাকায় অন্তত ২ হাজার ভবনে চুরি কথা স্বীকার করে। একই সঙ্গে রাজধানীতে আরও একাধিক চোরের বিষয়ে তথ্য দেয়। সেই তথ্য অনুযায়ী ডিবি পুলিশ আরও একাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করে।

জানা গেছে, ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার নজরুল ইসলাম সোহাগের চুরি শুরু হয় মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে। বাবা-মা না থাকার কারণে সে কাগজ কুড়িয়ে নিজের খরচ চালাত। এরপর পরিচয় হয় মতিঝিলের কাগজের মাঠ এলাকার এক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ির সঙ্গে। ওই ব্যবসায়ী তাকে বিভিন্ন বাসার গ্রিল কেটে ভেতর থেকে মালামাল নিয়ে আসার ট্রেনিং দেয়। আকারে ছোট হওয়ার কারণে সোহাগ খুব সহজেই বাসা ভেতরে ঢুকতে পারত। এ কারণে গ্রিল কাটা চোরের সর্দারদের কাছে তার কদর বেড়ে যায়। এক সময় ওই ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে ওস্তাদ বদল করে সোহাগ। এভাবে তিন উস্তাদের হাত বদল হওয়ার পর নিজেই চোরের সর্দার বনে যান। তার দলে টেনে নেয় একজন গাড়িচালককে। চুরির পর ওই গাড়িতে করে মালামাল নিয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করত বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে তার তিন ওস্তাদেরও সন্ধান করা হচ্ছে। তারা জামিনে এখন কারাগারের বাইরে অবস্থান করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই তিনজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে গ্রিলকাটা চুরি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

সূত্র মতে, ১০ থেকে ১২টি চক্রে বিভক্ত এসব চোর রাজধানীর আশপাশে বসবাস করে। বিশেষ করে সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও কামরাঙ্গীচরে তাদের ঘাঁটি। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে তারা ঢাকায় এসে বাসা রেকি করার পর চুরি করে। চুরি শেষে তারা ঢাকা ছেড়ে দেন।

জানা গেছে, এ ঘটনার আগে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে গ্রিলকাটা চোর চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ। গ্রেফতারকৃতরা হলো—মো. হাসান ওরফে জিসান, মো. কামাল হোসেন, মো. আবুল কালাম, মো. ফরহাদ, মো. নাহিদ শেখ ও মো. মানিক মিয়া।

তেজগাঁও গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহাদাত হোসেন সুমা জানান, বাসাবাড়িতে গ্রিল কেটে চুরির ঘটনায় মোহাম্মপুর থানা, চকবাজার থানা ও ধানমন্ডি থানায় মামলা রুজু হয়। গোয়েন্দা পুলিশ উক্ত মামলার ছায়া তদন্তকালে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়। এরপর মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান করে জিসান, কামাল, মো. আবুল কালাম, ফরহাদ ও নাহিদ শেখদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, নগদ টাকা ও ডলার উদ্ধার হয়। গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে এ চক্রের আরেক সদস্য মানিক মিয়াকে টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ গ্রেফতার করা হয়।

নয়াশতাব্দী/জেডআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ