ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

কী লাভ কী ক্ষতি

প্রকাশনার সময়: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:৩৮

বিশ্বের পাঁচটি দেশের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ‘হাই ভ্যালু কারেন্সি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীনের ইউয়ান তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ ডলারের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প মুদ্রায় ঝুঁকছে।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক চীনের মুদ্রায় এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে। ফলে ইউয়ানের লেনদেন করলে কী লাভ ক্ষতি আছে তা নিয়ে বিশ্লেষকরা নানা মতামত দিচ্ছেন। তদের মতে, বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারে তেমন বাধা নেই। তবে এটা কতটা কাজে আসবে সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের মোট আমদানির ৪০ শতাংশই হয় চীন এবং ভারত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট রফতানির ২৬ শতাংশ এবং আমদানির সাড়ে ৩ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। মোট রফতানির ৫৬ শতাংশ এবং আমদানির ৮ শতাংশ হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে।

যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল আমিন মনে করেন, আমরা যেহেতু রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি করি, তাই চীনা বা ভারতীয় মুদ্রা আমাদের কাছে তো তেমন থাকবে না। কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের অবস্থা কী, সেটা বিবেচনায় রেখে কাজ করছে সরকার।

নূরুল আমিন বলেন, ইউএস ডলারের মধ্যস্থতা থেকে বের হওয়ার জন্য বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারে উদ্যোগ ভালো। এতে ডলার নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু এটা কতটা সফল হবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে দেশের সক্ষমতার ওপর। তিনি বলেন, আমরা একটি আমদানি নির্ভর দেশ। ভারত থেকে আমরা আমদানি করি সাত-আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু রফতানি করি এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য। চীনে রফতানি করি এক বিলিয়নের নিচে। কিন্তু আমদানি করি এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে আমাদের কাছে চীনা মুদ্রা ইউয়ান পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকবে না। প্রচুর ভারতীয় রুপি থাকবে না। আর গোল্ড কেন মানুষ রাখে, কারণ এটার দাম তেমন কমবে না বলে মানুষের আস্থা আছে। ডলারের ওপরও তেমনি মানুষের আস্থা আছে। এখন দুই দেশের মুদ্রার ওপর পরস্পরের আস্থা কতটুকু তাই আসল কথা।

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং সেন্টার ফর পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিকল্প মুদ্রা থেকে আমাদের তো আবার ডলারেই কনভার্ট করতে হবে। তাতে তো তেমন লাভ হবে না। ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমি যদি চীনে রফতানি করে ডলার পাই। সেই ডলার দিয়ে তুলা আমদানির বিল মিটাতে পারি। তুলা আনতে হবে আমেরিকা থেকে। তাহলে আমার জন্য ডলারটা লাভজনক। এখন ইউয়ান যদি ডলারে কনভার্ট করি তাহলে তো এখানে কিছুটা লোকসান হবে। আবার একই ব্যক্তি কিন্তু আমদানি ও রফতানি করছেন না।

বিশ্লেষকরা জানান, বিশ্বের পাঁচটি দেশের মুদ্রা নিয়ে এখন ইন্টারন্যাশনাল কারেন্সি বাস্কেট করা হয়েছে। ইউএস ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, জাপানি ইয়েন এবং চীনা ইউয়ান। এশিয়ান ক্লিয়ারিং সিস্টেমের (আকু) মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলো তাদের আমদানি রফতানি দায় পরিশোধ করে। সেখানে ডলার মধ্যস্থতাকারী মুদ্রা। কিন্তু সেটা থাকলেও এর অধীনেই দুই দেশ তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করতে পারে। আবার চীন ক্রসবর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তুলেছে। এশিয়া আফ্রিকার ৩০-৩৫টি দেশ এই সিস্টেমের মধ্য দিয়ে লেনদেন করে। এটার কারেন্সি হচ্ছে চীনা ইউয়ান। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইলেও তা খুব ধীর গতিতে হচ্ছে বলে মনে করেন ড. আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলেন, এখনো ৫৯ শতাংশ রিজার্ভ হলো ইউএস ডলারে। ইউরো প্রায় ২০ ভাগ। আর সব মুদ্রা মিলিয়ে বাকি ২০ শতাংশ। ইউয়ান ২.২৫ শতাংশ। বিকল্প মুদ্রার ক্ষেত্রে ইউয়ান কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতীয় রুপিও হয়তো হবে। কিন্তু রুবল সম্ভব নয়। যেসব দেশ তাদের দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলবে তারা ডলার এড়িয়ে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে। এটা ইউয়ান, ভারতীয় রুপি, রাশিয়ান রুবল সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। তবে যাদের রফতানি বেশি তাদের সুবিধা। কারণ তাদের কাছে মুদ্রা জমা থাকবে।

নূরুল আমিন বলেন, তবে বিষয়টি নির্ভর করে ওই মুদ্রার ওপর কতটা আস্থা আছে তার ওপর। কারেন্সি পাওয়া কোনো সমস্যা হয় না যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ওই কারেন্সির অ্যাকাউন্ট থাকে। কারেন্সি পাওয়ার আরও একটি পথ আছে। সেটা হলো ইন্টারন্যাশনাল কনভার্সন। পাউন্ডকে ডলারে কনভার্ট করা যায়। তবে মুদ্রার মান কত হবে সেটা যে কোনো মুদ্রার ক্যাপাসিটির ওপর নির্ভর করে। ক্রস কারেন্সি মান প্রতিদিন নির্ধারণ হয় বাজারের ওপর। এটা সাধারণ মানুষের কাজ নয়।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের এটুকু লাভ হতে পারে যে, আমরা চীন ও ভারতে রফতানি করে তাদের যে মুদ্রা পাব তা ব্যবহার করতে পারব। তবে সেটা যদি কেউ বিক্রি করতে চান অন্যরা নাও কিনতে চাইতে পারে। এটা ব্যক্তির লাভের ওপর নির্ভর করে। এখানে আমদানির ক্ষেত্রে ডলার বাঁচবে। কিন্তু রফতানির ক্ষেত্রে তো আর সেটা হবে না। আসলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনই আসল কথা।

বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৬ শতাংশ চীন এবং ১৪ শতাংশ ভারত থেকে আসে। ওই দুই দেশে মোট রফতানির তিন শতাংশ করে হয়। বাংলাদেশে এখন রিজার্ভের পরিমাণ ৩৭.১৩ বিলিয়ন ডলার। আর ব্যাংকে এক ডলারের বিনিময় হার ৯৬ টাকা, খোলাবাজারে ১০৬ টাকা। গত এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা ডলার সাশ্রয়ের জন্য ইউয়ান ব্যবহারকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। তাদের ধারণা— ইউয়ান লেনদেন করে ডলার যতটা সাশ্রয় করা যায় সেটাই ভালো।

বাংলাদেশের একজন শীর্ষ স্থানীয় নিটওয়্যার রফতানিকারক এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলুল হক বলেন, চীনের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য করতে ভালো। কারণ, চীনও ইউয়ানে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ব্যাংকগুলোর কাছে ইউয়ান কতটা আছে সেটা একটা বিষয়। আমরা তো চীনে খুব বেশি এক্সপোর্ট করি না। ব্যাংকগুলোর কাছে যদি পর্যাপ্ত ইউয়ান না থাকে তাহলে ডলার দিয়েই ইউয়ান কিনতে হবে।

তিনি বলেন, রফতানিকারকদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তারা কত ডলার আয় করছে। বিষয়টিকে তারা সবসময় ডলারের ভিত্তিতেই হিসাব করেন। যারা রফতানি করবে তারা হয়তো ইউয়ানে পেমেন্ট নাও চাইতে পারে। এক্ষেত্রে জটিলতা হতে পারে।

এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, আমি যখন ইউয়ানে এক্সপোর্ট করব আমি তখন ইউয়ানের সঙ্গে ডলারের একটা হিসাব করবো। ইউয়ানের রেট কেমন হবে? ব্যাংক আমাকে কী রেট দেবে? ডলারের রেট তো ফিক্সড। ইউয়ানে ট্রেড করলে সেটা তো আসবে ব্যাংকের কাছে। ব্যাংক তখন আমাকে ইউয়ানের কী রেট দেবে? এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করা দরকার।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ