ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

দ্বন্দ্বের মূলে ক্ষমতা

প্রকাশনার সময়: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:২৮

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৫ মাস আগেই ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে থাকার হিসাব-নিকাশ নিয়ে বড় ধরনের বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে পল্লিবন্ধু এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। একদিকে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। অন্যদিকে, থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন সংসদের বিরোধীদলের নেতা ও পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ।

তাদের পেছনে সক্রিয় হয়েছে দুই গ্রুপের হেভিওয়েট নেতারাও। এর ফলে প্রতিদিনই আসছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, বিবৃতি। ঘটছে বহিষ্কারের ঘটনাও। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে দুশ্চিন্তায় দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও। দুই পক্ষই যোগাযোগ রেখে চলছে সরকারপক্ষের সঙ্গে। মাঠের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও জাপাকে কাছে টানার চেষ্টা করছে।

তবে সরকারের কাছে আস্থার ‘প্রতীক’ হিসেবে কার্যত রওশন এরশাদই এগিয়ে রয়েছেন। তাই দিন যতই গড়াবে জাপাতে রওশন এরশাদপন্থিদের পাল্লা ভারী হতে থাকবে। কারণ হিসেবে দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, বর্তমানে জি এম কাদেরের বক্তব্য ও চলাফেরা সন্দেহজনক! সরকার ও বিএনপির ‘দুই নৌকা’য় পা দিয়ে চলতে চাইছে তিনি। যদিও জি এম কাদের এরই মধ্যে বলেছেন— তারা সরকারের সঙ্গে বা জোটে নেই।

দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাপার বেশিরভাগ সংসদ সদস্য আছেন জি এম কাদেরের সঙ্গে। কিন্তু তারা কতদিন সঙ্গে থাকবেন, সেটা একটা প্রশ্ন। ভালো কিছুর ইঙ্গিত পেলে তারাও ভিন্নদিকে পা দিতে পারেন। কারণ বেশ কয়েক এমপি আছেন, যারা রওশনের পাশাপাশি জি এম কাদেরের সঙ্গে সখ্য বজায় রাখছেন। আগামীতে ক্ষমতায় যেতে তারাও জি এম কাদেরের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাপার সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশায় তার হাতেই ছিল দলটির নিয়ন্ত্রণ। তারা মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের নেতৃত্বে চলছিল পার্টি। তবে এখন এককভাবে দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় দুজনই। এক পক্ষ সরকারের সঙ্গে থাকতে চায়। অন্য পক্ষ বলছে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে তবেই তারা তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন।

এমতাবস্থায় সরকারবিরোধী দলগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে জাপা। কারণ জাতীয় পার্টি অনেক হিসাব-নিকাশের ফ্যাক্টর। তাই সরকার পতনের আন্দোলনে তাদের পাশে চাইছে। যা বিগত দুই নির্বাচনেও রাজনৈতিক টানাহেঁচড়া ছিল অনেকটাই প্রকাশ্য। বিএনপির সঙ্গেও সুসম্পর্ক রেখে চলতে চাইছেন অনেকে। আসছে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির সামনে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে।

জি এম কাদেরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এখন কথা বলছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ। দলের মধ্যে ভিন্ন তৎপরতায় নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন তিনি। সরকারের সুদৃষ্টিতে থাকায় তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন।

রওশন এরশাদের পক্ষ থেকে তিনি দলের কয়েক সিনিয়র নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন। ওই নেতারা এখন জি এম কাদেরপন্থি নেতাদের সন্দেহের তালিকায় আছেন। তারা বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে রওশন এরশাদের কারণেই শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল।

অন্যদিকে, রওশনের অনুসারীদের উদ্দেশে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলে আসছেন, কেউ দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। ‘শৃঙ্খলা ভাঙার’ অভিযোগে ইতোমধ্যে পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

এরপর গত শনিবার জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি জিয়াউল হক মৃধাকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পদ থেকেও বাদ দেয়া হতে পারে তাকে। বাদ পড়লেও তাদের রওশনের এরশাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

দুই পক্ষেরই সামনে একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জাতীয় পার্টির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা হলো, আগামী নির্বাচনে তারা কোন পক্ষের সঙ্গে সুর মেলাবে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে, নাকি সরকারবিরোধীদের সঙ্গে? নাকি নিজেদের মতো করে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে? তবে অনেকেই মনে করেন, দলটি নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে। যাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখবে, শেষমেশ তাদের দিকেই ঝুঁকবে দলটি।

সূত্র বলছে, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে জি এম কাদেরসহ শীর্ষ নেতারা দলের বৈঠকও করেছেন। আর এমন খবরে রওশন এরশাদ খুব বিরক্ত। এই নিয়ে ‘দ্বিধা-বিভক্ত’ জাপা। তবে রওশনপন্থিরা এবারও আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে চাইছে। তারা মনে করেন, এবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সরকার গঠন হবে। ফলে তিনি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকতে চান। তবে আগামী কাউন্সিলে নেতৃত্ব বদল হলেও জাপার উভয়পক্ষ (রওশন-কাদের) বিগত দিনের মতোই ক্ষমতায় থাকার পক্ষপাতী।

দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, ক্ষমতায় না গেলে দলটি অস্থিত্ব সংকটে পড়বে। কিন্তু আগামী নির্বাচন কী প্রক্রিয়ায় হবে, কোন দল ক্ষমতায় আসবে, তা দলটির নেতাদের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। যে কারণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় তারা। তাই তিনি এবার দলের নেতৃত্ব নিতে চান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যম সারির দুই নেতা বলেন, ভাবি রওশনের সঙ্গে দেবর জি এম কাদেরের দ্বন্দ্ব অনেক পুরোনো। জি এম কাদের চাকরিজীবন ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে আসার পর থেকেই রওশন বিরক্ত। এ বিরক্তির ছাপ বিগত নির্বাচনে ও দলের নেতৃত্বের পালাবদলের সময়েও ছিল। কিন্তু বর্তমানে সংকট বা দ্বন্দ্ব দুজনের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নয়; এ দ্বন্দ্ব ক্ষমতায় থাকা না-থাকার দর্শন নিয়ে। তবে রওশন এরশাদ দেশে না আসা পর্যন্ত এ দ্বন্দ্বের পরিণতি পরিষ্কার হবে না।

দলটির সম্পাদক পর্যায়ের আরেক নেতা বলেন, জাতীয় পার্টিতে কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূল জাপার দূরত্ব অনেক দিনের। এ ছাড়া তৃণমূলে এরশাদের জন্ম ও মৃত্যুদিন ছাড়া আর কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে জাপা বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, তাতে রংপুর অঞ্চলের দু-একটি আসন ছাড়া একক নির্বাচনে আর কোথাও জিততে পারবে না। ফলে জাপা যে কোনো উপায়ে জোটে থাকতে চায়। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এবং কোন জোট ক্ষমতায় আসবে, তা স্পষ্ট হলে দলটি সিদ্ধান্ত নেবে।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি এখন ঐক্যবদ্ধ। দলবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তারা অবগত। তবে এসব নিয়ে তারা খুব একটা ভাবছেন না। আপাতত আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া ও তৃণমূলে দল গোছানোর লক্ষ্য নিয়েই কাজ করা হচ্ছে।

জাতীয় পার্টি কোনো বড় জোটে যোগ দেবে কিনা— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়াই এখন পার্টির প্রেসিডিয়ামের সিদ্ধান্ত, পরবর্তীতে কী হবে তা নির্বাচনি সময়ের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। জোট এবং ভোটের বিষয়ে নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি কী হবে সেটা হয়তো এখনই আঁচ করা যাচ্ছে না।

জানা যায়, দলটি আগামী নির্বাচনে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকেও নজরে রাখা হয়েছে দলটির গতিবিধি। রওশন এরশাদের সম্মেলন ডাকা, বিরোধীদলীয় নেতার আসনে থেকে রওশন এরশাদকে সরাতে এমপিদের চিঠি পাঠানো, উপনেতা থেকে সরাতে পাল্টা চিঠি রওশনপন্থিদের, জি এম কাদেরের মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের পর ফোন উদ্ধার সবকিছুই পার্টির চলমান ঘটনাপ্রবাহকে মিলিয়েও দেখছেন কেউ কেউ।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ