ঢাকা, রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘সর্বনিম্ন ভাড়া’ কার স্বার্থে

প্রকাশনার সময়: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:০৫

ঢাকাবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেল চালু হচ্ছে আগামী ডিসেম্বরে। আপাতত চলবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত মেট্রোরেলের প্রতিটি কোচ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি)। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করবে। এরই মধ্যে মেট্রোরেলের ভাড়াও নির্ধারণ করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। যেখানে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে ৫ টাকা। সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। দূরত্ব ও কিলোমিটার হিসেবে যা বাস ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাসের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া নির্ধারণ করায় যাত্রীরা মেট্রোরেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। আর এর সরাসরি বেনিফিশিয়ারি হবে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা। তাদের হয়েই একটি মহল পেছন থেকে উচ্চভাড়া নির্ধারণের ইন্ধন দিচ্ছে। উদ্দেশ্য মেট্রোরেলকে অজনপ্রিয় করা।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অর্থরিটি (বিআরটিএ) নির্ধারিত বাস ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি আড়াই টাকা। কিন্তু এই ভাড়া রয়ে গেছে কেবল কাগজে-কলমেই। অবৈধ ঘোষিত ‘ওয়েবিলে’র নামে যাত্রীদের পকেট কেটে নেয়া হয় ইচ্ছেমতো ভাড়া। এ কারণে সাধারণ যাত্রীরা কিছুটা আশায় ছিলেন— ডিসেম্বরে চালু হতে যাওয়া মেট্রোরেলের। হয়তো আর ‘যন্ত্রণা’ সয়ে উঠতে হবে না বাসে! প্রয়োজন পড়বে না বাস চালক ও হেলপারদের সঙ্গে তর্ক-বির্তকের। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষা অনেকটাই হোঁচট খেয়েছে মেট্রোরেলের নির্ধারিত ভাড়ার হারে।

যাত্রীরা জানান, কম দূরত্বে যেতে হলে তাদের যে টাকা খরচ করতে হবে তা বাসে হতো না। তাই খুব বেশি আনন্দের কিছুই ঘটবে না। তাদের প্রশ্ন— কাদের স্বার্থে এই ভাড়া নির্ধারণ? মেট্রোরেলের সুবিধা পাবে তাহলে কারা?

প্রতি কিলোমিটারে মেট্রোর ভাড়া পাঁচ টাকা। কেউ শাহবাগ থেকে কাওরানবাজার এলেও তাকে ভাড়া গুনতে হবে ২০ টাকা। আবার কাওরানবাজার থেকে প্রেসক্লাব গেলেও একই ভাড়া। সেখানে বাস ভাড়া ১০ টাকা। প্রতিবেশী ভারতের কলকাতায় যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম মেট্রোরেল। সেখানে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া দেড় থেকে আড়াই টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া ৬ টাকা।

লাভের মুখ দেখা দিল্লি মেট্রোর ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি তিন টাকারও কম। নয়াদিল্লি ও চেন্নাইয়ের মেট্রোর সর্বনিম্ন ভাড়া ১২ টাকা। আর পাকিস্তানে সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা ৫০ পয়সা। এই হিসেবে ঢাকার মেট্রোরেলের ভাড়া কলকাতার তিন গুণের বেশি, দিল্লি ও চেন্নাইয়ের প্রায় দ্বিগুণ ও পাকিস্তানের আড়াই গুণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মেট্রোরেলের নির্ধারিত ভাড়ায় নিরুৎসাহ করা হয়েছে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের। পাশাপাশি নিম্নবিত্তের ক্রয় ক্ষমতাকেও বিবেচনায় আনা হয়নি। যাত্রী পাওয়া না গেলে দিন শেষে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকতে হবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএলকে)। কারও কারও মতে, বাস্তবায়িত মেট্রোর সুবিধা ভোগ করবে ঢাকার ১০ ভাগেরও কম মানুষ। মেট্রোতে ভাড়া কমানো হলে ভর্তুকির টাকা তুলতে ভ্যাট-ট্যাক্সে ভর করতে হবে।

জানতে চাইলে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে নয়া শতাব্দীকে বলেন, সরকার মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করেছে ২০ টাকা। এই ভাড়া অস্বাভাবিক। কারণ যেখানে প্রাইভেট বাসের ভাড়া ১০ টাকা, সেখানে রেলের মতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার ভাড়া দ্বিগুণ। এর ফলে সাধারণ জনগণের পরিবহন ব্যয় বাড়বে। আর এতে অধিক লাভবান হবে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা। তাই মেট্রোর ভাড়া ৫০ শতাংশ কমিয়ে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা করা প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেট্রোরেলকে অজনপ্রিয় করার জন্য একটি মহল তৎপর রয়েছে। তারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। এদের মধ্যে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা থাকতে পারেন। তবে এ সবের দালিলিক প্রমাণ থাকে না।

জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী নয়া শতাব্দীকে বলেন, পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মেট্রোরেল নির্মাণ খরচ হয়েছে তিন থেকে চার গুণ বেশি। বড় অংকের এই খরচের বোঝা যাত্রী সাধারণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চায় সরকার। কিন্তু সব যাত্রীর সামর্থ্য এক নয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা মেট্রোরেল ব্যবহার করবেন, যাদের নেই তারা এড়িয়ে চলবেন। ফলে মেট্রোরেলের যে সক্ষমতা সেটি পুরোপুরি ব্যাহত হবে। সরকারকে এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি দাবি করেন, মেট্রোরেলের ভাড়া পুনরায় নির্ধারণ করা, গণপরিবহনের চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মেট্রোরেলের ভাড়া যাতে বেশি না হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেট্রোরেল ভাড়া যৌক্তিক হয়নি। তাই বাস মালিকরা বিশেষ সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান রেল ব্যবস্থা রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত আসতে খরচ হয় ১৫-২০ টাকা।

সুতরাং খরচের মানদণ্ডে নিয়ে এলে আমাদের অপারেশন কস্ট আরও বেড়ে যাবে। কারণ প্রতিটি মেট্রোরেলে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে চলাচল করলে যে খরচ হবে ৫০০ যাত্রী নিয়ে চলাচল করলেও একই খরচ। তাই মেট্রোরেলে যাতে বেশি মানুষ চলাচল করতে পারে- সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া খুবই জরুরি।

পরিবহন বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সামসুল হক বলেন, বিনিয়োগের রিটার্ন আসবে মূলত যাত্রীর ভাড়া থেকে। বাইরে যাত্রী পাওয়া যায় না; সেখানে লোকসংখ্যা কম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা। রাইডারশিপ বাড়লে কিন্তু ভাড়া কমিয়ে আনা যায়। তাই যাত্রীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে রাইডারশিপকে আকর্ষণীয় করে ভাড়া কমিয়ে, স্টেশনের আশপাশে নন অপারেটিং বিনিয়োগ করে লাভজনক করে ফেলা হয়েছে।

জানতে চাইলে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ও পরিবহন বিশ্লেষক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান নয়া শতাব্দীকে বলেন, মেট্রোরেলের সঙ্গে গণপরিবহনের তুলনা করা উচিত নয়। কারণ মেট্রোরেলের কিলোমিটারপ্রতি মাসে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৪-৫ কোটি টাকা। সেখানে গণপরিবহনে ব্যয় একশ’ টাকা। পিক আওয়ারে ঢাকার সড়কে সাধারণ যানজট থাকে। অথচ মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে যেতে সময় লাগবে ২০ মিনিট। তাই সময় ও যানজটের বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক দেশের মেট্রোই ভর্তুকি দিয়ে চলে। ভাড়া যদি কমাতে হয় তবে সরকারকে আরও ভর্তুকি দিতে হবে। তখন পাবলিক প্রাইসিং করতে হবে। অর্থাৎ যারা মেট্রোরেল ব্যবহার করবে না, তাদের উপার্জনের একটা অংশও এখানে ঢুকে যাবে। কারণ ভাড়া কমালে যাদের অ্যাফোর্ড করার ক্ষমতা আছে তাদেরও ভর্তুকি গুনতে হবে সাধারণ জনগণকে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশই ভর্তুকির পরিমাণ এখন কমিয়ে আনছে।

মো. হাদিউজ্জামান আরও বলেন, মেট্রোরেলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাদের যাতায়াতের ওপর একটা ডিসকাউন্ট দেয়া যেতে পারে। যেমন করে মাসিক, সাপ্তাহিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ সুবিধা রয়েছে।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ