ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাবুলের নিশানায় বনজ

প্রকাশনার সময়: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:২১

পুলিশের সাবেক এসপি বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতুকে কুপিয়ে হত্যার মামলায় বাবুল আকতারকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এরই মধ্যে পিটিআইর প্রধান বনজ কুমার মজুমদারসহ ছয় পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেছেন কারাগারে থাকা সাবেক এসপি বাবুল আক্তার। অপরদিকে গত মাসের শুরুতে সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে বাবুলের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রধানের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া আসামি ভোলাও তার জবানবন্দি জোর নেয়া হয়েছে বলে দাবি করছেন। সব মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডটি।

জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার নয়া শতাব্দীকে বলেন, আসামিপক্ষ সব সময় সুবিধা পাওয়ার জন্য নানা ধরনের অপপ্রচার চালায়। মিতু হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও তেমনই চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে তদন্ত কর্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। খুব শিগগিরই চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। এ কারণে তারা নানা ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে।

জানা গেছে, পিবিআই হেফাজতে থাকার সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দাবি করে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ ড. বেগম জেবুন্নেছার আদালতে বাবুল আক্তার মামলার আবেদন করেন। সেখানে আসামি করা হয়েছে পিবিআই প্রধানসহ ৬ জনকে। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. মনির হোসেন সরকার জানান, আদালত মামলাটি আদেশের জন্য ১৯ তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

জানা গেছে, পিবিআইর করা মামলার চার্জশিট দেবার আগে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাবুল আকতারের মামলার আবেদন করায় নতুন করে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সন্দেহের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। মামলার আবেদনে অন্য যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন— পিবিআই চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের এসপি নাজমুল হাসান, চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের এসপি নাঈমা সুলতানা, পিবিআইয়ের সাবেক পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা, এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম ও সংস্থাটির চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের পরিদর্শক কাজী এনায়েত কবিরকে। এর মধ্যে নাজমুল হাসান বাবুল আকতারের ব্যাচমেট; মহিউদ্দিন সেলিমও তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

সূত্রমতে, নিহত মিতুর স্বামী বাবুল আকতারসহ সাতজন আসামিকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে পিবিআইর চার্জশিটে। সাক্ষী করা হয়েছে ৯১ জনের। বাবুল আক্তার তার শ্বশুরের দায়ের করা মামলায় ১৫ মাস ধরে ফেনী কারাগারে আটক রয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতের জমা দেয়ার আগে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করা হলেও ভোলা নিজের দেয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি প্রত্যাখ্যান করতে চান। তবে আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি প্রত্যাহারের সুযোগ আছে নাকি নেই ; এমন মতানৈক্যও তৈরি হয়েছে। আসামি এহতেশামুল হক ভোলা জবানবন্দি দেয়ার আগে একটি বিশেষ ডায়েরির মাধ্যমে বিষয়টি আদালতকে অবহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ভোলা ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারেরও আবেদন জানিয়েছেন।

যদিও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক জবানবন্দি প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সুতরাং, ভয় দেখানোর অভিযোগ সঠিক নয়। আসামি এহতেশামুল হক ভোলা ২০১৮ সালের ৬ মে থেকে হাইকোর্ট থেকে স্থায়ী জামিনে রয়েছেন।

জানা গেছে, মিতু হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় গেলো ১২ মে নতুন করে দায়ের করা মামলায় বাবুলকে গ্রেফতার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবুল আক্তারকে নেয়া হয় পাঁচ দিনের রিমান্ডে। ১৭ মে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল আক্তারকে ১৬৪ জবানবন্দি নেয়ার জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার জাহানের খাসকামরায় হাজির করার পর স্ত্রী মিতু হত্যায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দেয়ায় আদালত থেকে কারাগারে নেয়া হয়েছে। এর আগে ৫ দিনের রিমান্ড শেষে কড়া নিরাপত্তায় বাবুলকে আদালতে নেয়া হয়।

এদিকে, ভারতীয় নারী গায়েত্রীর উপহার দেয়া বইয়ে বাবুল আকতারের লেখাকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। বাবুলের কথিত প্রেমিকা গায়েত্রী অমর সিং-এর কোনো হদিস না মেলার কারণে পুরো হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনাবিষ্কৃত থেকে যাচ্ছে বলে তারা দাবি করছেন। এ বিষয়ে তারা গত ২ আগস্ট আইজিপি বরাবর একটি আবেদন করেন। সেখানে বলা হয়েছে, পিবিআই প্রধানের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হচ্ছেন বাবুল আক্তার। এ কারণে তারা অন্যকোনো সংস্থা দিয়ে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন করে দোষীদের শাস্তি চেয়েছেন।

সূত্রমতে, উপহার দেয়া বইয়ের পাতায় বাবুল আকতারের হাতের লেখা শনাক্ত করা হলেও গায়েত্রী অমর সিং-এর লেখাকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। এর আগে পিবিআইর প্রধান বনজ কুমার এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে মিতুর স্বামী বাবুল আকতারের নাম জানিয়েছিলেন। এমন নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাবুলের পরকীয়া তথ্য, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সঙ্গে বিকাশে টাকা লেনদেনের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে, তদন্ত প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় নিয়েছে আসামি ভোলার ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অস্বীকারে। তার দাবি, পিবিআইর কর্মকর্তারা তাকে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন তিনি আদালতে সেটাই বলেছেন। নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে নিজের সন্তানকে স্কুলে নেয়ার পথে খুন হন বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতু। হত্যাকাণ্ডের পর জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও শেষমেশ স্বামী বাবুল আকতারের দিকে এগোতে থাকে সন্দেহ। স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দেয়ার কারণে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণেও জটিলতা তৈরি হয়। তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আকতার তার সোর্সদের দিয়ে নিজের স্ত্রীকে কেন হত্যা করেছেন— সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর নেই তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে। গায়েত্রীর সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আকতারের পরকীয়া তথ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না মেলার কারণে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেই সব প্রশ্নের জট খুলতে অপেক্ষা করতে হবে চার্জশিট জমা দেয়া পর্যন্ত। তবে কবে নাগাদ চার্জশিট আদালতে জমা দেয়া হবে সেই সম্পর্ক সুনির্দিষ্ট করে কোন তথ্য দিতে পারছেন পিবিআইর কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে বাবুল আক্তার আদালতে মামলার আবেদন করায় নতুন করে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। বাবুলের আবেদনে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ১৫ (১) ধারা এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ৫ (২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাদীর আইনজীবী কপিল উদ্দিন বলেন, ২০২১ সালের ১০ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সময়ে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা অফিসে বাবুল আক্তারের ওপর নির্যাতন করা হয়। স্ত্রী হত্যার ঘটনায় মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য বাবুল আক্তারের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়। এ কারণে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় সড়কে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দফতরে যোগ দিতে ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বাবুল আকতার। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন বাবুল। তবে পুলিশ তদন্তে তার সম্পৃক্ততার গুঞ্জন ছিল আগে থেকেই। এরপর তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। গেল ছয় বছরের নানা নাটকীয়তায় নতুন আলোচনার সৃষ্টি করেছে বাবুল আকতারের দায়ের করা মামলা।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ