ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

গুজবঅস্ত্রে ভয়

প্রকাশনার সময়: ৩০ জুলাই ২০২২, ১৭:৫৭

দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফায়দা লোটা, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুবিধা পেতে দেশে বিগত কয়েক মাস ধরে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে নানা ধরনের গুজব। নাচুনে বুড়ির মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তিশালী উপস্থিতি এ প্রক্রিয়াকে নানাভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে সহজেই গুজব নির্ভর তথ্য ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হওয়ায় কিছু মহল পরিকল্পিতভাবেই কাজটি করে যাচ্ছে। সরকারে আসীন আওয়ামী লীগও বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত এবং গুজব প্রতিরোধে দলটি নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী দেশে ৫ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে যে জনগোষ্ঠী রয়েছে সেটির ৫৫.৮৬ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকেন। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের রয়েছে অ্যানড্রয়েড বা স্মার্টফোন। অর্থাৎ প্রায় ৬-৭ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আওতায় রয়েছে। ফলে পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে, জিন দিয়ে চিকিৎসা চলছের মতো কুসংস্কারমূলক নানা গুজবের মতো বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে, এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎহীন হয়ে যাচ্ছে দেশ, রিজার্ভ ফুরিয়ে যাবে এক মাসের মধ্যে, জ্বালানি তেলের সংকট আসন্ন—এমন গুজবও ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। কখনো কখনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধেও ভিত্তিহীন সংবাদ যা প্রকারান্তরে গুজবেরই নামান্তর তা প্রচারের অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে যা ওই সংবাদ মাধ্যম দুটি অস্বীকার করতে পারেনি।

সাবেক সচিব মনোয়ারুল ইসলাম নয়া শতাব্দীকে বলেন, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নয়, দেশের সব স্তরেই এখন গুজব ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এসব গুজব যেন মানুষ বিশ্বাস করে, সেজন্য গুজবগুলোকে ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। গুজবের কার্যকারিতা যে অস্বীকার করা যায় না সেটি বোঝাতে গিয়ে তিনি নয়া শতাব্দীকে বলেন, হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবলসের সেই তত্ত্ব তো আমরা ভালোই জানি। তিনি বলেছিলেন, একটি মিথ্যা বারবার বলে সেটিকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তথ্যের শক্তি সম্পর্কে তিনি ভালোই অবগত ছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায়ও এটি আরো বেশি সত্য। এ নিয়ে মানুষের সচেতনতা যেমন প্রয়োজন, সরকারের সতর্ক থাকারও দরকার আছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয়েছে, জামায়াতের একটি বিশেষ টিম সারা দেশে গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে এবং এই গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে জামায়াতের নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ব্যবহার করছেন, তেমনি ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত যোগাযোগকেও। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ এক যুগ পরে আবার লোডশেডিং ফিরে এসেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়ার জন্য এবং মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই গুজবগুলো ছড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার একটি এলাকায় গুজব ছড়ানো হয় যে, মসজিদে বিদ্যুৎ থাকবে না। এই গুজব ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে মুসল্লিদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতা বিষয়টি জানেন এবং তারপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে চলে যান। যাওয়ার পর তিনি মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং জানান, মসজিদে বিদ্যুৎ থাকবে না এরকম কোনো নির্দেশনা সরকারের পক্ষ থেকে নেই। পরবর্তীতে তিনি খবর নিতে চেষ্টা করেন, কারা গুজবটি ছড়ালো। খবর নিয়ে দেখেন, স্থানীয় জামায়াতের একজন পলাতক নেতা টেলিফোনে কয়েকজন মুসল্লিদের বলেছেন, মসজিদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে। এরকম স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে গুজব ছড়ানোর নজিরটি শুধু এলাকাভিত্তিক নয়, দেশব্যাপীও হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে প্রতিনিয়ত গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশের ডলার পরিস্থিতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো হয়ে যাচ্ছে এমন তথ্য দেয়া হচ্ছে, জ্বালানি তেল থাকবে না এমন তথ্য দেয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রথম শ্রেণির একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ৪০০ টাকার বেশি মোটরসাইকেলে তেল দেয়া হচ্ছে না এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ৩ হাজার টাকার বেশি তেল দেয়া হচ্ছে না। পরবর্তীতে এই খবরটিকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় জামায়াত এবং সেখানে শুধু ট্রাস্ট পেট্রলপাম্পের কথাই বলা হয়নি, বলা হয়েছে পুরো বাংলাদেশেই এই নিয়ম করা হয়েছে এবং গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় যে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। পরবর্তীতে যখন বিপিসির চেয়ারম্যানের তীব্র প্রতিবাদ করলেও পত্রিকাটি এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি বা তাদের প্রতিবেদনের স্বপক্ষেও যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি। আর জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফরমগুলো থেকেও খবরটি উঠানো হয়নি। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য নিয়েই জামায়াত পরিকল্পিতভাবে গুজবগুলো ছড়াচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই প্ল্যাটফরমগুলো ডলার সংকট নিয়েও গুজব ছড়িয়েছে এবং ডলার নেই, এই ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছে। এসব গুজবের প্রধান লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করা, জনগণ যেন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সেই চেষ্টা করা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এরকম গুজব ছড়ানোর বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। সরকার বিষয়টি নিয়ে ওয়াকিবহাল এবং এ ধরনের গুজবগুলো যারা ছড়াচ্ছে তাদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সরকার যথাযথ ভূমিকা নেবে।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অনলাইনে দলীয় প্রচারণা চালানো, গুজব এবং অপপ্রচারের জবাব দিতে প্রতিটি সংসদীয় আসনে ১০০ জন করে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে দায়িত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির পক্ষ থেকে দলীয় এমপিদের চিঠি দেয়া হয়েছে। জুন মাসের শেষে এই চিঠি বিতরণ করা হয়। চিঠিতে সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত তথ্যসহ ১০০ জন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের তালিকা জমা দিতে সব এমপিকে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের একটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বেশ কিছু আসন থেকে ই-মেইলে ও হার্ডকপি আকারে তালিকা প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির হাতে এসেছে। যারা এখনো তালিকা জমা দেননি তাদের দ্রুত তালিকা প্রস্তুত করে জমা দিতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। শিগগিরই এসব তালিকা নিয়ে বৈঠক করবে প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সমন্বিতভাবে ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ প্ল্যাটফরমে গ্রুপভিত্তিক কাজ করবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা। তাদের কাজ হবে, আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন ও আগামীর ভিশন সম্পর্কে জনসাধারণকে বারংবার অবগতকরণ এবং দেশবিরোধী অপশক্তির অপপ্রচার রোধ ও মোকাবিলা।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, এর আগে গত এপ্রিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী প্রচারণা, দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে গুজব এবং নিজেদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং টিম গঠন করে আওয়ামী লীগ। এ টিম গুজব প্রতিরোধের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতিও প্রচারে কাজ করছে। অনলাইন এই কার্যক্রম সমন্বয় করার জন্য ২২ সদস্যের মনিটরিং উপ-কমিটি গঠন করে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপ-কমিটি। এই কমিটি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কাজ করছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপ-কমিটির উদ্যোগে দলের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) সহযোগিতায় বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল ও জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কোনো প্রকার গুজব অপপ্রচারের মাধ্যমে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে সেই লক্ষ্যে কাজ করছে এই টিম।

এক লাখ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের একটি প্ল্যাটফরমও তৈরি করছে দলটি। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য ১০ হাজার মাস্টার ট্রেনার তৈরি করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপ-কমিটি। এজন্য সারা দেশে শতাধিক কর্মশালাও করা হয়েছে। সূত্র জানায়, মনিটরিং টিম বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা ও সক্রিয় অনলাইন কর্মীদের সঙ্গে অনলাইন কার্যক্রম সমন্বয় করবে। অনলাইনে দলীয় কার্যক্রম মনিটর করবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রণয়ন করবে। ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচার কৌশল’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজনে সিআরআইকে সহযোগিতা করবে। ওয়ার্ড, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অনলাইন কর্মীদের তথ্য-উপাত্ত প্রস্তুত করবে। অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী গুজব ও অপপ্রচার নির্ভর কার্যক্রম মনিটরিং করবে ও নিয়মিতভাবে দলীয় ফোরামে রিপোর্ট উপস্থাপন করবে। এ ছাড়া তারা প্রযুক্তিনির্ভর যেকোনো কার্যক্রমে দলকে সহযোগিতা করবে।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ