মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪৩০

হেফাজতকে ছাড়

প্রকাশনার সময়: ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৯:১৫ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৯:৪০

নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে হেফাজত ইসলামী বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ২০৩ মামলা। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় এসব মামলা দায়ের হয়। কিন্তু দিনের পর দিন ধরে তদন্ত চললেও কিছুতেই সুরাহা করতে পারছিল না তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজত নেতাদের সাক্ষাতের পর এখন এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে পুলিশ সদর দফতর থেকে। এর আগে হেফাজত নেতারা কয়েক দফা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার পাশাপাশি গ্রেফতারকৃতদের জামিন দিতে অনুরোধ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে মামলাগুলো সমাধান করার পাশাপাশি নেতাদের জামিন নিয়ে কাজ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, সরকারের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা পেয়ে পুলিশও কাজ শুরু করে দিয়েছে। গত এক মাসের ব্যবধানে অন্তত ১০ নেতা জামিন পেয়েছেন। তারা যে কোনো সময় কারামুক্ত হবেন বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। তবে মামুনুল হক আপাতত মুক্ত হচ্ছেন না। তার বিষয়ে সরকারের মনোভাব এখনও ইতিবাচক নয়। ধারণা করা হচ্ছে, জামিন পাওয়ার পর আবারও সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন মামুনুল হক। এ কারণে তার মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি ঝুলে গেছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, হেফাজতের মামলাগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। দেখি কী করা যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে তারা অফিস আদালতসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল তারা। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। আমরাও চাচ্ছি মামলাগুলো দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি হোক।

তবে হেফাজত নেতারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর মামলা প্রত্যাহার ও নেতাদের জামিনে মুক্ত হওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারাও ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছেন। এসবের জন্য সরকারের সঙ্গে এক প্রকার সমাঝোতায় গিয়েছি আমরা। তবে কী ধরনের সমাঝোতা হয়েছে তা এক্ষুনি প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এতটুকু বলা যায়, সরকারপ্রধানের আশ্বাস বাস্তবায়ন হচ্ছে।

হেফাজত নেতারা সমঝোতার বিষয়বস্তু প্রকাশ না করলেও বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনের আগে তারা কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করবে না। উল্টো সরকারকে তারা বিভিন্ন দিক দিয়ে সহায়তা করবেন। তাদের এমন ওয়াদার পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইনের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে মামলাগুলো সমাধানের নির্দেশ দেন।

ধারণা করা হচ্ছে, হেফাজতের মামলাগুলোর দ্রুতই ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশ ছাড়া পাবলিক বাদী হয়ে দায়ের করা মামলাগুলো তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া শতাব্দীকে বলেন, হেফাজতের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে মৌখিক নির্দেশনা পাওয়া গেছে। মূলত মামলাগুলো প্রত্যাহার বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার পরিকল্পনা আছে আমাদের। ইতোমধ্যে তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে কাজ করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া গত এক মাসে হেফাজতের অন্তত দশ নেতা জামিন পেয়েছেন।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হেফাজত নেতারা সরকারের সঙ্গে সমাঝোতায় গেছেন। বিশেষ করে তারা রাজনৈতিক কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড চালাবেন না। শুধু ইসলাম নিয়ে কথা বলবেন। জামায়াত ইসলামীর কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারকদের আশ্বস্ত করেছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।

নাম প্রকাশ না করে কয়েক তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলাগুলো দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি করতে পুলিশ সদর দফতর থেকে বেশকিছু নির্দেশনা এসেছে। এই নিয়ে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। মামলাগুলো থেকে অনেক আসামি জামিনে আছেন। আবার কেউ কেউ জামিন ছাড়াই প্রকাশ্য আছেন। দীর্ঘদিন ধরে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় সমালোচনা হচ্ছে সবখানে। এগুলোর দ্রুত সুরাহা চাচ্ছি আমরাও। ২০১৩ সালের ৬ মে বাগেরহাটে হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে হেফাজতের দুজন কর্মী মারা যান। ওই ঘটনায় ফকিরহাটে ৪টি ও সদর থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ।

এতে হেফাজত, জামায়াত, স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীসহ অন্তত ১২ হাজার জনকে আসামি করা হয়। তারমধ্যে একটি মামলার বিচার হয়েছে। রায়ে আসামিরা খালাস পেয়েছেন। ৫ মে তাণ্ডবের পর ঢাকাসহ ৭টি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। দুটি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। আর ১৮টি মামলার অভিযোগপত্র দিলেও এর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। তাছাড়া এখনও ৪৯টি মামলার তদন্ত চলমান আছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০১৩ সালের শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ৫ মে ঢাকার ৬টি প্রবেশমুখে অবরোধ করে। এক পর্যায়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় তারা। এ সময় হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তারা রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাংচুর করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এসব সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

আবার ২০২১ সালে মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। এই সময় তার সফরের বিরোধিতা করে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। ২৬ মার্চ রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়।

একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু ও পুলিশসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হন। হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। এসব ঘটনায় সারাদেশে ১৫৪টি মামলা দায়ের করা হয়। তবে কোনো মামলারই তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগপত্রই দেয়া হয়নি।

জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস বলেন, মাসখানেক আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা একটি বৈঠক করেছি। বৈঠকে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সবাই ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদের বক্তব্য ধৈর্যসহকারে শোনেন। তাৎক্ষণিক তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার পাশাপাশি কারাগারে আটক নেতাদের জামিন ও মুক্ত করার নিদের্শনা দেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে খুবই আশাবাদী।

তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো ধরনের রাজনীতি করি না। ইসলাম নিয়ে কাজ করছি। একটি মহল আমাদের নামে অপবাদ রটাচ্ছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করেছি। তাকে আমরা জানিয়েছি, আমরা কখনও রাজনীতি করছি না আর করবও না।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আমরা গত ১৭ ডিসেম্বর বৈঠক করেছি। ওই বৈঠকে সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেন। ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট বৈঠকটি হয়। বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে কথা হয়েছে বৈঠকে। নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বেশকিছু প্রস্তাব অনুরোধ করা হলে তিনি নিজেই নোট নেন। মাওলানা মামুনুল হকসহ হেফাজতের সব নেতাকর্মীর মুক্তির দাবি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সমঝোতা ছাড়া কোনোকিছুই সমাধান হয় না তা সত্য। আমরা চাই না সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি হোক। শাপলা চত্বরের ঘটনার পর ২০২১ সালে বেশি মামলা হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। তারমধ্যে ঢাকার মতিঝিল, পল্টন ও যাত্রাবাড়ী থানায় ১৪টি মামলা হয়।

তাছাড়া চট্টগ্রামে ১১টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে সদর থানায় ১২টি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩৭টি, সরাইল থানা পুলিশ বাদী হয়ে ২টি, আশুগঞ্জ থানা পুলিশ বাদী হয়ে ১টি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পক্ষ থেকে ৩টি ও আখাউড়া রেলওয়ে পুলিশ ১টি, নারায়ণগঞ্জে ৮টি, মুন্সীগঞ্জে ১০টি, কিশোরগঞ্জে ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। আশা করি এসব মামলা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিবে পুলিশ। তাছাড়া আমরা পুলিশের সঙ্গে এই নিয়ে কথাও বলেছি। তারা ইতিবাচক হিসেবে বিষয়টি আমলে নিয়েছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ