ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

প্রকাশনার সময়: ০২ নভেম্বর ২০২২, ১৬:০৩

রাজধানীর পল্লবীর সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ বর্তমানে দুর্নীতি ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি চক্র পুরো প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে রেখেছে। ভর্তি বাণিজ্য, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় উৎসব, বিভিন্ন জাতীয় দিবস, মাঠ সংস্কার, জঙ্গল পরিষ্কার, পুরোনো ভবন বিক্রি, বৃক্ষ রোপণসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের নামে ভুয়া বিল করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন খোদ কলেজের অধ্যক্ষ জহুরুল আলম বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীবৃন্দ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় অধ্যক্ষের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা এবং অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ৫ হাজার টাকা নেওয়া নিয়ম পরিণত হয়েছে। পর্দা কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে কলেজে বৃক্ষ রোপণ করা হয়। একবার ২০ হাজার টাকার গাছ কেনা দেখানো হলেও মাত্র ১০-১২টি গাছ লাগানো হয় গাছ না কিনেই। কলেজের তৃতীয় শ্রেণির এক কর্মচারী জানান, চায়ের কাপ-পিরিচ থেকে শুরু করে কোদাল, হাতুড়ি, করাত, শাবলসহ ক্রোকারিজ আইটেমের টাকাও নয়-ছয় করেন তিনি।

লুটপাটের খণ্ডচিত্র : ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অর্থায়নে কলেজে জাতির পিতার ম্যুরাল তৈরি করা হয়। ২০২০ সালে ওই ম্যুরালের পর্দা কেনা বাবদ ২০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়। ‘মায়ের দোয়া ক্লথ স্টোর’ নামে দোকানের বিল-ভাউচার দেখানো হয়। জানা গেছে, ভাউচারটি ভুয়া। ওই অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাছুমা জাহান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রথমে কেনাকাটার কথা তিনি অস্বীকার করেন। এ সংক্রান্ত ভাউচারে তার স্বাক্ষর থাকার কথা উল্লেখ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান, কলেজের ভাউচার আপনি পেলেন কিভাবে?

মিরপুর-১১ নম্বরের ‘মায়ের দোয়া ক্লথ স্টোরের’ মালিক আনিছুর রহমান জানান, তার দোকানে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা গজ দরে পর্দা বিক্রি হয়। সে হিসাবে ওই পর্দার দাম এক থেকে দেড় হাজার টাকা। ভাউচারটি তার দোকানের হলেও তিনি ওই কলেজে কখনও কোনো পর্দা বিক্রি করেননি।

চলতি বছরের জুনে কলেজের খেলার মাঠ সংস্কারের জন্য ১ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান দেয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। কেনাকাটায় মিরপুর-১২ নম্বরের ‘মা মমতাজ স্টিল’ এর ভুয়া ভাউচার জমা দেওয়া হয়। ওই দোকানের মালিক স্বপন জানান, ভাউচারটি ভুয়া। জালিয়াতি করে বানানো হয়েছে। ওই কলেজে তিনি কোনো মালামাল বিক্রি করেননি।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাস মহামারিকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রতি মাসে আপ্যায়ন ও জ্বালানি তেল বাবদ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা অধ্যক্ষ জহুরুল আলম উত্তোলন করেছেন। এ ছাড়া কলেজের প্রশাসনিক ভবনের তৃতীয় তলার টিনশেড ঘর বিনা টেন্ডারে বিক্রি এবং ফলজ ও বনজ গাছ কেটে বিক্রি করারও প্রমাণ মিলেছে। ঢাকা বোর্ডের নির্দেশ অমান্য করে ২০২২ সালের এইচএসসি প্রথমবর্ষের টিসি দেওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুনঃভর্তি বাবদ ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ডিগ্রি (পাশ), ডিগ্রি প্রাইভেট ও অনার্সের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ অতিরিক্ত এক থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ খাতে প্রতি বছর কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হয়।

২০২১ সালের ডিগ্রির প্রাইভেট শিক্ষার্থী স্বর্ণা আক্তার জানান, তার কাছ থেকে ভর্তি বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু ৭৩৫ টাকার রশিদ দেওয়া হয়। বাকি টাকার রশিদ চেয়েও তিনি পাননি।

বিষয়টি স্বীকার করে কলেজের ডিগ্রির (প্রাইভেট) দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মোদাচ্ছের বলেন, ডিগ্রির শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাবদ যে টাকার রশিদ (৭৬৫ টাকা) দেওয়া হয়নি তা কলেজের খাতায় এন্ট্রি রয়েছে। কলেজে এলে যে কেউ তা দেখতে পারবেন। হাতেও এরকম অনেক ভুয়া বিল-ভাউচার এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ আছে।

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তিনি অনার্সের শিক্ষকদের ছাড়পত্র ও আত্তীকৃত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের বিল (এরিয়ার বিল) ভাউচার স্বাক্ষরের বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে নেন। তার অর্থের চাহিদা মেটাতে না পেরে এক অফিস সহকারী বিপাকে পড়েন। ঘটনাটি কলেজের সবার মুখে মুখে। সাংবাদিক পরিচয়ে জানতে চাইলে ওই অফিস সহকারী পুরোনো ঘটনা না টানতে অনুরোধ করেন।

অধ্যক্ষ জহুরুল আলমের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে ২০২০ সালের জুনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) তদন্ত করার চিঠি দেয়। তখন মাউশি সরকারি বাংলা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষকে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ওই তদন্ত কর্মকর্তার অধীনে এক সময়ে জহুরুল চাকরি করেন। এ কারণে তদন্ত আর বেশিদূর এগোয়নি। অধ্যক্ষ জহুরুলের কর্মকাণ্ড জেনে চলতি বছর জুনে স্থানীয় সংসদ-সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা শিক্ষামন্ত্রী বরাবর ডিও দেন। এতে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কলেজের তহবিল তছরুপ, ভুয়া বিল-ভাউচার জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন, জামায়াত-শিবিরের পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষার পরিবেশ ও শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল, শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া ছাত্রলীগের রাজনীতি কলেজে নিষিদ্ধ করার অভিযোগও আনেন সংসদ-সদস্য।

এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ জহুরুল আলমের কাছে জানতে চাইলে জরুরি মিটিং ও পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা জানান তিনি। পরে তিনি ফোন দিতে বলেন। কিন্তু একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

নয়াশতাব্দী/এমএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ