ঢাকা, রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

তারুণ্যের দৃষ্টিতে নারীর পোশাকে স্বাধীনতা

প্রকাশনার সময়: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৫০

সারাদেশে নারীর পোশাকে স্বাধীনতা নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। নারীর পোশাকে স্বাধীনতা কেমন হওয়া উচিত, শিক্ষার্থীর ভাবনা ও মতামত তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক তোহা ইসলাম

আমি মনে করি, একজন মানুষ হিসেবে অন্যান্য ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো পোশাকের স্বাধীনতাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটাকে কোনোভাবেই লংঘন করার সুযোগ নেই। তবে একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং মুসলিম নারী হিসেবে সবার আগে ধর্মের নিয়ম নীতিগুলোকে সমর্থন করা দরকার। পুরোপুরি ধর্মের নিয়ম মেনে না চলতে পারলেও সামাজিক শালীনতা বজায় রেখে চলার চেষ্টা চালাতে হবে। সর্বক্ষেত্রে যে, মেনে চলতে পারি এমনটিও নয়। তবে সেটা অবশ্য করণীয় বলে মনে করি।

আমি মনে করি, প্রতিটি মুসলিম নারীর যথাসম্ভব তার ধর্মের রীতিনীতি মেনে পোশাক পরিধান করাটাই উচিত। একজন মুসলিম নারী তার পোশাক সম্পর্কে জ্ঞান থাকা উচিত এবং না থাকলেও সেটা অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। সব কিছু জানার পরেও যে ভুল পথে পরিচালিত হবে, সেটা তার একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তার পরিবার ছাড়া আর কারোই নেই৷ এখানে কেউই কখনোই তার ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করার অধিকার রাখি না। এবং এক্ষেত্রে আমি পোশাকের জন্য তাকে হয়রানি হওয়ার বিষয়টিকে চরমভাবে অসমর্থন করি এবং এটি একটি প্রতিবাদের দাবি রাখে। কারণ, যার যার কর্মফল সে নিজেই ভোগ করবে। এখানে রেসারেসি করে অন্যের জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারোর নেই।

কারো চোখে কোন মানুষের পোশার সংক্রান্ত বিষয় খারাপ লাগলে আমরা তাকে খুব বেশি হলে সঠিক উপদেশ দিতে পারি, তাও সেটা খুব নম্রতা এবং ভদ্রতার সাথে, এবং মূল বিষয় হচ্ছে সে যদি উপদেশ গ্রহণে ইচ্ছুক হয় তবেই। ধর্মের নামে রেসারেসি করা কখনো আমার ধর্ম শিক্ষা দেয় না। সবশেষ এটাই বলতে চাই যে, প্রতিটি ব্যক্তিমাত্রই তার নিজ নিজ ধর্ম সংক্রান্ত জ্ঞান, তার সমাজ ও দেশের সংস্কৃতি সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। এবং কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা এটিও একটি ধর্মীয় ও সামাজিক শিক্ষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

নারী-পুরুষ সবার জন্যই পোশাক সৌন্দর্যবর্ধক একটি বস্তু। সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি মানুষের পোশাক পরার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো- অঙ্গ-প্রত্যক্ষসমূহ ঢাকা ও সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে শালীনতা বজায় রাখা। সম্প্রতি পোশাক নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে। একদল লোক অশালীন পোশাকের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের মন্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আরেকপক্ষ পোশাকের স্বাধীনতা চায়। দু'পক্ষেরই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। পোশাকের স্বাধীনতা চাওয়া লোকেরাও তাদের মতামত ব্যক্ত করতে আন্দোলনে নামতে পারে। কিন্তু তার মানে আন্দোলনের নামে এই নয় যে, অশ্লীল পোশাক পরে রাস্তায় গিয়ে চিল্লাপাল্লা করতে হবে৷ স্বাভাবিক উপায়ে কি দাবি জানানো যেত না? পোশাক নিয়ে নানাজনের নানা রুচি থাকতেই পারে।

কিন্তু কথা হলো- বেশি পোশাক পরাকে সেকেলে, আর কম পোশাক পরাকে কেন আধুনিক মনে করা হবে? কেন পোশাকের স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে বিকিনি নামক অতি ক্ষুদ্র লজ্জাস্থান আবৃতকারী পোশাক পরে রাস্তায় বের হওয়ার জন্য চিল্লাপাল্লা করা হবে? এত কম পোশাক তো শুনেছি আদিম মানুষেরা পরতো। তবে কি আদিমরাই বেশি আধুনিক ছিল?

দিনে দিনে আমরা সভ্য ও আধুনিক হচ্ছি। কিন্তু কতটুকু? সেই মাপকাঠি যেন শুধুই 'পাশ্চাত্য সংস্কৃতি'। কথায় কথায় ইংরেজি শব্দোচ্চারণ এবং পোশাক-আশাকে পশ্চিমা সংস্কৃতির বহুল ব্যবহারকে আমরা আধুনিকায়ন বলতে পছন্দ করি। আর এই তথাকথিত আধুনিকতার ফাঁদে পরে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রায় ভুলতে বসেছি।

বাংলাদেশের 'বাঙালি সংস্কৃতি' স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এদেশের সংস্কৃতি বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে যেমন গভীরভাবে জড়িত তেমনি এই সংস্কৃতিতে ধর্মেরও একটি প্রভাব রয়েছে। এটি কয়েক শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়েছে।

সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো- 'পোশাক'। 'পোশাকের স্বাধীনতা' থাকাটা আমি মনে করি, জরুরি। কোনো পোশাক পরিধানের কারণে একজন ব্যক্তি হেনস্তার শিকার হবেন, এমনটি কখনোই কাম্য নয়। তবে, ‘পোষাক নির্বাচন করাটা’ আরও জরুরি। পোষাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির উচিত নিজ দেশের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া। বিপরীত লিঙ্গের মানুষ নিশ্চিত সিডিউসড হবেন জেনেও ছোট পোশাক পরিধান করলাম পাশাপাশি 'ধর্ষণ' এবং ' যৌন-হয়রানি' ও কমাতে চাই, বিষয় দুটি সাংঘর্ষিক। বিষয়টা এমন যে, ‘ঘরের লকারের চাবি চোর সর্দারের হাতে তুলে দিলাম, একইসাথে তাকে চুরি না করার নির্দেশ দিলাম’। মহামারি 'ধর্ষণ' বা সামাজিক ব্যধি 'যৌন-হয়রানি' ঠেকাতে একপাক্ষিক চাপ প্রয়োগ না করে নারী ও পুরুষ উভয়কেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা উচিৎ। এরপরও যারা ধর্ষণ বা যৌন-হয়রানির মতো ন্যাক্কারজনক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবে না, তাদেরকে আইনি আওতায় আনতে পারলেই আমরা সত্যিকারের সভ্য ও আধুনিক হতে পারবো।

সৃষ্টির অন্যান্য জীব থেকে মানুষকে সেরা ধরা হয় তার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যর জন্য যার মধ্যে অন্যতম একটি হলে শালীনতা। শালীনতা মেনে চলতে প্রতিটি ধর্মেই বলা হয়েছে। যদিও আমাদের সংবিধানে পোশাকের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের পোশাকের ব্যাপার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করেই পোশাক পরা উচিত।

বিয়ে কিংবা ডিজে পার্টিতে গেলে আমরা যে পোশাক পরিধান করি, সেই পোশাক পরে নিশ্চিয়ই খেলার মাঠে খেলতে গেলে পরিধান করি না, কেন পোশাকের তো স্বাধীনতা আছে, তাহলে কেন পরি না। অনেকে পশ্চিমাদের অনুকরণ করে তাদের মতো পোশাক পরতে বেশি পছন্দ করে কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদের ভালো দিকগুলো যেমন- শিক্ষা, চিকিৎসা, টেকনোলজি ইত্যাদিকে অনুসরণ করতে আমাদের ভালো লাগে না। একটা গবেষণায় দেখা যায়, দেশে যতো নারী ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে, তার অধিকাংশ অশালীন পোশাকের কারণে। কেননা, বৈপরীত লিঙ্গের (নারীদের) উপর আকষর্ণ অনেকাংশেই বেড়ে যায় পোশাকের কারণে। সুতরাং, পরিশেষে বলা যায়, নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পোশাক পরিধানের অধিকার সবার আছে, কিন্তু দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সামাজিকতা বিবেচনা করেই পোশাক পরিধান করাটাই বেশি সমীচীন হবে।

নারীর পোশাকের স্বাধীনতা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়। পোশাকের স্বাধীনতা মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম অধিকার। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার রাখে, তাদের নিজস্ব পোশাক পছন্দের ক্ষেত্রে। কিন্তু নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পোষাক পরিধান করতে যেয়ে আমাদের পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অনুসরণ করার প্রবণতাটি বেমানান। আমাদের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে। সেই সংস্কৃতিকে আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের পরিপ্রেক্ষণ অনুযায়ী, আমাদের বিষয়গুলো চিন্তা করতে হবে, কিন্তু অবশ্যই আমরা একজন নারীকে বলপ্রয়োগ করতে পারবো না, বোরখা বা হিজাব পরিধান করতে। আমাদের উচিত ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষণ থেকে পোশাক বাছাই করা।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ