মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

রফতানি আয়ে যুদ্ধের ধাক্কা

প্রকাশনার সময়: ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০৯:১৭

বিশ্বমন্দার পূর্বাভাস যেন পুরোটাই পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। ইউক্রেন রাশিয়ার ধাক্কা বোধহয় পুরোটাই লেগেছে এবার। বাণিজ্য ঘাটতি— সে তো বহু আগে থেকেই চূড়ায়। সম্প্রতি রফতানি আয়ে যে সুখবর দেখা গেছে— সেপ্টেম্বরে সেটাও উল্টোপথে হেঁটেছে। সবশেষ ১৩ মাস আগে রফতানি আয়ে এত কম প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বর থেকে যা ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে পুরো বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। খাদ্যে দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি— যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই রফতানি আয়ে।

সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন দেশে ৩৯০ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের চেয়ে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। আর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ কম।

এ বছরের সেপ্টেম্বরে পণ্য রফতানি থেকে ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। ১৩ মাস পর পণ্য রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখল বাংলাদেশ।

পোশাক রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। তাদের এখন খাদ্যের পেছনেই অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সে কারণেই রফতানি আয় কমছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) হিসাবে এখনও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা ১২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করছেন। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি দশমিক ৬২ শতাংশ।

১৩ মাস পর রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধিতে হোঁচট খেল বাংলাদেশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগের বছরের জুলাইয়ের চেয়ে রফতানি আয় কমেছিল ৬ দশমিক শূন্য এক শতাংশ। এর পর থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে রফতানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হচ্ছিল। ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষ হয়েছিল।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে এসে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে রফতানি আয়ে যে ধাক্কা লেগেছে, তা মূলত তৈরি পোশাক রফতানি কমার কারণে হয়েছে। গত মাসে ৩১৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ কম। গত মাসে ওভেন ও নিট উভয় ধরনের পোশাক রফতানিই হ্রাস পেয়েছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পোশাক রফতানিতে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশের বেশি, পাট ও পাটজাত দ্রব্যে ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ, প্লাস্টিক পণ্যে ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ ও চামড়াজাত পণ্যে ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম আয় হয়েছে একাধিক পণ্যে। কৃষিপণ্যে ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, কেমিক্যাল পণ্যে ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ ও কাঁচাজাত পণ্যে ৫২ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম আয় হয়েছে।

পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এবং বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। তাদের এখন খাদ্যের পেছনেই অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সে কারণেই আমাদের রফতানি আয় কমছে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করছে। এ অবস্থায় আগামী দিন আমাদের রফতানি আয়ে সুখবর নেই বলেই মনে হচ্ছে।

বিজিএমইএ পরিচালক ও মুখপাত্র মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে যে প্রবৃদ্ধিতে মন্দা হবে, সে বিষয়ে ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ। যা সেপ্টেম্বরের রফতানি পরিসংখ্যানে স্পষ্টতই প্রতিফলিত হয়েছে। কোভিডপরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী খুচরা বাজার বিভিন্ন সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে, কনটেইনারের অপ্রতুলতা এবং সাপ্লাই চেইন সংকট, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে পূর্বাভাস অনুযায়ী মন্দার আবির্ভাব; যার কারণে খুচরা বিক্রয়ে ধস নেমেছে, ক্রেতাদের পোশাকের চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে, প্রভৃতি সংকটে শিল্প বিপর্যস্ত।

তিনি বলেন, ক্রেতারা তাদের ইনভেন্টরি এবং সাপ্লাই চেইনকে নিজেদের জন্য লাভজনক রাখতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ উৎপাদন এবং অর্ডার পর্যন্ত আটকে রেখেছে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সামগ্রিকভাবে শিল্পের জন্য একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আমরা টেকসই উন্নয়ন এবং প্রতিযোগী সক্ষমতায় আমাদের শক্তি আমরা দেখিয়েছি, তারপরও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ২০২২ সালের শেষ ত্রৈমাসিকের জন্য আশাব্যঞ্জক কিছু অনুমান করা কঠিন করে তোলে।

এর আগে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধিতে প্রথম হয়। ইউরোস্ট্যাট প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ১ হাজার ২২৩ কোটি বা ১২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করে ইইউ অঞ্চলে চীন প্রথমে রয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ১৩১ কোটি বা ১১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

তবে প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে বাংলাদেশ সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে সারাবিশ্ব থেকে ইউরোপে পোশাক রফতানি ২৫ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে শুধু বাংলাদেশ থেকেই বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগের বছর একই সময়ে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে পোশাক রফতানি করেছিল ৭৮২ কোটি বা ৭ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ