ঢাকা, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

স্বস্তির বাজার কতদূর

প্রকাশনার সময়: ০১ অক্টোবর ২০২২, ০৮:৫৩

কখনও ডলারের দাম বৃদ্ধি, কখনও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাত— এসবেই অস্থির দেশের নিত্যপণ্যের বাজার। অবশ্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, প্রতিযোগিতা কমিশনের তথ্য বলছে— দাম যতটা বাড়ার কথা কারসাজি করে তার চেয়ে বেশি অস্থিতিশীল করা হয়েছে বাজার। এ কারণে বাজার স্থিতিশীল করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন দেশের খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে করেছে মামলা।

জানা গেছে, ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালাচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। করা হচ্ছে জরিমানা। কিন্তু ভুক্তভোগীরা মনে করছেন এসবের খুব একটা প্রভাব পড়ছে না বাজারে। শুধু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযান আর জরিমানাই নয়, ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে বেধে দেয়া দামও মানছেন না ব্যবসায়ীরা।

এমন অবস্থায় সম্প্রতি প্রতিযোগিতা কমিশনের পক্ষ থেকে বাজার ‘অস্থিতিশীল’ করার অভিযোগে শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা, এস আলম, স্কয়ার, প্রাণ, এসিআই, সিটি, আকিজ, মেঘনাসহ ৩৬ প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আবার প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত মূল্য নেয়ার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছে ভোক্তা অধিকার। মামলার পর অভিযোগ প্রমাণ হলেও যে পরিমাণ জরিমানার বিধান আছে তা সংশোধনের কথা বলছেন কেউ কেউ।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, পণ্যে কারসাজি করে বিপুল অঙ্কের টাকা মুনাফা করার পর অল্প টাকার জরিমানা নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা করতে হয় না বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। যদিও সরকারি এই দুই সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, বাজার পরিস্থিতি ঠিক রাখতে তারা কঠোর নজরদারি করছেন। কোনোভাবে তারা বাজার অস্থিতিশীল করতে দেবেন না।

সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত বাজার অস্থিরতার সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি শোনা যায়। তারপরও বাজার রয়ে যায় একই অবস্থায়। যেমন— চালের সংকট নেই বলে খাদ্যমন্ত্রী তথ্য দিলেও বেড়েই চলেছে চালের দাম। ডিমের দাম কেন বাড়ছে তার কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না খোদ কৃষিমন্ত্রী।

প্রতিযোগিতা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশনে আইন অমান্যে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হবেন ব্যবসায়ীরা। প্রয়োজনে অতি মুনাফাখোর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারাও বলছেন, পণ্যে কারসাজির সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক তাদের ছাড় দেয়া হবে না। এরই মধ্যে অবশ্য বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডেকে পাঠিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করা থেকে বিরত থাকার কথা বলেছে সংস্থাটি। অন্যথায় ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

আবার প্রভাবশালী এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করলেও শেষ পর্যন্ত যাতে উপযুক্ত শাস্তি হয় তা নিশ্চিতের দাবি করছে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘মামলা করার সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু তাদের শুনানিতে ডাকাসহ পরবর্তী কাজগুলো যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। পণ্য কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি হতে হবে। যাতে অন্যরা সতর্ক হয়।’ মামলা হওয়া কোম্পানিগুলো প্রভাবশালী হওয়ায় কোনো চাপেই যাতে নিজেদের শক্ত অবস্থান থেকে সরে না আসে সেজন্য প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান ক্যাব সভাপতি।

প্রতিযোগিতা কমিশনের অভিযোগ— অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে চাল, আটা, ময়দা, ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও টয়লেট্রিজ পণ্যের ‘অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে অস্থিরতা’ তৈরি করেছে। তাই প্রতিযোগিতা কমিশনের নিজস্ব আইনে সম্প্রতি এ মামলা করা হয়। মামলার দিন ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেছিল কমিশন। পরে বাকিদের নাম প্রকাশ করা হয়। সব মিলিয়ে মোট ৪৪টি মামলায় ৩৬ ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।

ক্যাবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাঠামো অনুযায়ী ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ভোক্তা অধিদফতরও যথেষ্ট নয়। এর জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন।

প্রতিযোগিতা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের মধ্যে কিছু কোম্পানির শুনানি হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি মামলার শুনানি হবে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের নিজস্ব আইনে মামলা হয়েছে। আমরা প্রত্যেককে শুনানির জন্য ডাকব। শুনানিতে অপরাধ প্রমাণ হলে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘জরিমানার পরিমাণ হবে কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বছরে যে পরিমাণ টার্নওভার করে, তার সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত।’

প্রতিযোগিতা কমিশনের জালে পড়ল যারা: কমিশনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চালের বাজারে ‘অস্থিরতার জন্য’ স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের চেয়ারম্যান, এসিআইয়ের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান অথবা এমডি, প্রাণ ফুডসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অথবা এমডি, সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কুষ্টিয়ার রশিদ অ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্টের স্বত্বাধিকারী আবদুর রশিদসহ আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের চাল ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

আটা-ময়দার বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আকিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি, এসিআই, টি কে গ্রুপের এমডি, নুরজাহান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এমডি, এস আলম রিফাইন্ড ইন্ডাস্ট্রির এমডি এবং সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডির বিরুদ্ধে মামলা করেছে কমিশন।

ডিমের বাজারে মূল্য কারসাজির জন্য সিপি বাংলাদেশ কোম্পানির এমডি বা সিইও, প্যারাগন পোলট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড এগ লিমিটেডের এমডি, পিপলস ফিডের স্বত্বাধিকারী, কাজী ফার্মস গ্রুপের এমডি কাজী জাহেদুল হাসান, ডিম ব্যবসায়ী আড়তদার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আমানত উল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

পোল্ট্রি মুরগির বাজারে অস্থিরতার জন্য কাজী ফার্মস গ্রুপের এমডি কাজী জাহেদুল হাসান, সাগুনা ফুড অ্যান্ড ফিডসের পরিচালক, আলাল পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিডের এমডি বা সিইও, নারিশ পোলট্রি ও হ্যাচারির পরিচালক, প্যারাগন পোলট্রির এমডি এবং সিপি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

টয়লেট্রিজ সামগ্রীর (সাবান, সুগন্ধি সাবান ও গুঁড়া সাবান) অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে এসিআইয়ের চেয়ারম্যান, ইউনিলিভার বাংলাদেশের এমডি, স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান বা এমডি, কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি (তিব্বত) ও কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান অথবা এমডি। ৩৬ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, এদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সেটাই বড় কথা। আমরা চাই যারা মানুষের পকেট থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের যথাযথ শাস্তি হোক।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ