ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ব্যর্থ ডলারের নতুন দর

প্রকাশনার সময়: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:১৬

ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে গত রোববারের সিদ্ধান্ত এক দিনও টিকল না। সিদ্ধান্ত ছিল সোমবার থেকে কার্যকর হবে ডলারের নতুন দর। কিন্তু তা কার্যকর করেনি কোনো ব্যাংক। উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বিনিময়মূল্য আরও ১ টাকা বাড়িয়েছে। এক মাস টাকা-ডলারের বিনিময় হার ছিল ৯৫ টাকা। নতুন দর কার্যকর হওয়ার দিন ১ টাকা বেশিতে (৯৬ টাকা) বিক্রি করা হয়। এর আগে বাফেদা ও এবিবির নতুন দর কার্যকর হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তারা।

তারা বলেন, যে দর বাফেদা-এবিবি নির্ধারণ করে দিয়েছে তা এ মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন হবে। বাস্তবতার নিরিখে বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে ডলার বেচাকেনা হবে। বাজারে দুটো রেট থাকবে। একটি হলো যেটি তারা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটি, আরেকটি হলো কালোবাজার বা কার্ব মার্কেট। ফলে দাম নির্ধারণ করে দিয়ে বাস্তবায়ন খুব কঠিন ব্যাপার। বাজারে মনিটরিং করা খুব সহজ ব্যাপার নয় বলে মত দেন তারা।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ অথরাইজড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) গত রোববার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় সোমবার থেকে রফতানি নগদায়নে প্রতি ডলার হবে ৯৯ টাকা, আমদানিতে যা পড়বে ১০৪ টাকা ৫০ পয়সা। আর প্রবাসী আয় এক ডলারে লেনদেন হবে ১০৬ টাকায়।

গত সোমবার রাষ্ট্রীয় খাতের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় দেখা গেছে, এবিবি ও বাফেদার বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। অধিকাংশ ব্যাংক ডলারের নতুন বিনিময় হার বাস্তবায়ন করেনি। বলা হচ্ছে, কোনো নির্দেশনা না আসায় তারা আগের মতোই ডলার কেনাবেচা করছে।

রাষ্ট্রীয় খাতের সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, বিদেশে গমনেচ্ছু গ্রাহকরা ডলার কিনতে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরছেন। এদিন সোনালীসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা পর্যায়ে রফতানি, আমদানি কিংবা প্রবাসী আয়ে লেনদেন হয়েছে গত রোববারের দরে। নতুন দর নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা মিলেছে ব্যাংক লেনদেন শেষ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে। এক আমদানিকারক বলেন, ‘সোমবার পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তির জন্য ডলারপ্রতি ১০৪ টাকা পর্যন্ত গুনেছি। অভিন্ন দর কার্যকর হলে খরচ কিছুটা বাড়লেও নৈরাজ্য বন্ধ হবে। এছাড়া মঙ্গলবার এই দর ১০৮ টাকা ছিল।’

এবিবি চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘ডলারের যে নতুন বিনিময় হার বেঁধে দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হতে দুই-এক দিন সময় লাগবে। বাস্তবায়নের জন্য বাফেদা থেকে রোববারই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে যেহেতু এটা নতুন ধারণা, নতুন বিনিময় রেট শিট তৈরি করে প্রসেস শুরু করতে একটু সময় লাগছে।’

তিনি বলেন, ‘দিনের শুরুতে কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে দিনশেষে এটা ঠিক হয়ে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় সব ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানরা সারাদিনে কী কী সমস্যা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করছেন। নতুন দর পুরোপুরি কার্যকর হতে প্রথম তিন বা চারদিন একটু সময় লাগবে।’

আর রফতানিকারক ও প্রবাসীরা এই হারে ডলার লেনদেন করতে পারলেও আমদানিতে নতুন হার কার্যকর করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে জানান তিনি। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকগুলোতে সরবরাহ বেড়ে আন্তঃব্যাংক কার্যকর হলে অসাধু চক্রের কারসাজি বন্ধ হবে।

এদিকে ব্যাংকগুলোতে ডলারের দাম নিয়ে নৈরাজ্য বন্ধে নতুন সিদ্ধান্ত আসার পরও খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৪ টাকায়।

ডলার বাজারে অস্থিরতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে এবিবি ও বাফেদা। সিদ্ধান্ত হয়, বাজার পর্যালোচনা করে ডলারের দাম ঠিক করবে সংগঠন দুটি। ব্যাংকগুলো নিজেরাই এ দাম নির্ধারণ করবে। তারই অংশ হিসেবে রোববার নিজেরা সভা করে ডলারের দাম ঠিক করেন বাফেদা ও এবিবির নেতারা।

এদিকে অভিন্ন দর নির্ধারণের পর দিনই গত সোমবার ডলারের দাম আরেক দফা বাড়ে। প্রতি ডলার ১ টাকা বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ডলারের নতুন মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৬ টাকা। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও নিচে নামে।

জানা গেছে, সোমবার বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ থেকে ৯৬ টাকায় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটাকে আন্তঃব্যাংক রেট বা ব্যাংক রেট বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতিদিন যে ডলার বিক্রি করে থাকে, তা এই রেটে বিক্রি করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, সোমবার রিজার্ভ থেকে ৯৬ টাকায় ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইদিনে বাংলাদেশ ব্যাংকও আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের দাম এক টাকা বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ থেকে সোমবার ৯৬ টাকা দরে ব্যাংকগুলোর কাছে ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। সরকারি আমদানি বিল মেটাতে ব্যাংকগুলোর কাছে এ ডলার বিক্রি করা হয়। ফলে এটাই ডলারের আনুষ্ঠানিক দর।

এর আগে গত রোববার প্রবাসী আয়, আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি ও রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে নতুন দাম ঠিক করেন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ অথরাইজড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) নেতারা।

সংগঠন দু’টির নেতারা মিলে প্রবাসী আয়ে ১০৮ টাকা, আমদানি দায় নিষ্পত্তিতে ১০৪ টাকা ৫০ পয়সা ও রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করে ৯৯ টাকা। এর আগে, গত ১০ আগস্ট ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৩০ পয়সা কমানো হয়েছিল। তাতে ডলারের দাম দাঁড়িয়েছিল ৯৫ টাকা।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ