ঢাকা, সোমবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯, ৭ রজব ১৪৪৪

মান নিম্ন, দাম চড়া

প্রকাশনার সময়: ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৯:৩৯

২৭তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার উদ্বোধন হয় গত ১ জানুয়ারি। মেলায় শোভা পাচ্ছে হরেক পণ্যসামগ্রীর স্টল। পণ্যের স্টলের পাশাপাশি মেলায় রয়েছে খাবারের দোকান। এসব দোকানে খাবারের মান নিম্ন হলেও রাখা হচ্ছে চড়া দাম। মান ও দাম নিয়ে উঠছে বিস্তর অভিযোগ।

দর্শনার্থীদের অভিযোগ, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করে দাম রাখা হচ্ছে অনেক বেশি। আবার এসব খাবারের অফার দিয়েও সাধারণ মানুষের সঙ্গে চলছে প্রতারণা। যদিও রেস্তরাঁ মালিকদের দাবি, খাবারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা এক কর্মচারী নয়া শতাব্দী বলেন, এবারের মেলায় খাবারের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নির্ধারণ করে দিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এরপরও কোনো কোনো দোকান তালিকার চেয়েও খাবারের দাম বেশি রাখছে।

সরজমিন দেখা যায়, গতবারের চেয়ে এবারের মেলায় খাবারের দোকানের সংখ্যা বেশি। দর্শনার্থীও বেশি আসছেন মেলায়। আবার খাবারও খাচ্ছেন রেস্তরাঁয়। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দাম বেশি রাখায় রেস্তরাঁ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও বাগবিতণ্ডা করছেন দর্শনার্থীরা। তারা বলছেন, খাবারের মূল্য এত বেশি পরিবারের চার সদস্য নিয়ে হালকা খেতে বসলেও বিল আসে প্রায় ১ থেকে ২ হাজার টাকা। অথচ সাধারণভাবে বাইরের দোকানে বিল আসতো ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা।

উত্তরা থেকে আসা লামিয়া আক্তার কণা নামের এক দর্শনার্থী নয়া শতাব্দীকে বলেন, গতবারের চেয়ে এবারের মেলায় সবকিছুর দাম অনেক বেশি। বলতে গেলে এখানে চার সদস্য নিয়ে হালকা খেতে গেলেও মিনিমাম ১৫০০ টাকা বিল আসবে। বাইরে একটা চাপ খেতে গেলে বিল রাখে ১৩০ টাকা, আর এখানে একটি চাপের মূল্যই রাখে ২২০ টাকা। একটি নান রুটির মূল্য ৬০ টাকা। যা অস্বাভাবিক!

তিনি বলেন, খাবারের মান ও দাম নিয়ে রেস্তরাঁ মালিক পক্ষের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা অস্বীকৃতি জানায় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের দোহায় দেখায়। তারা বলে এখানে খাবারের দাম যা নির্ধারণ করা হয়েছে সবটিই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নির্ধারণ করে দিয়েছে।

সামিয়া আক্তার নামের এককর্মী নয়া শতাব্দীকে বলেন, বাড্ডা থেকে এসে মেলায় একটি পোশাকের প্যাভিলিয়নে কাজ করছি। বাসা থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে আসতে না পেরে বাধ্য হয়ে মেলার রেস্তরাঁ থেকে চড়াও দামে নিম্নমানের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এতে যা বেতন পায় তার তিন ভাগের দেড়ভাগই খরচ হচ্ছে। এরার আবার যাতায়াত ভাড়াও রয়েছে অনেক। কিন্তু কিছু করার নেই আমরা নিরুপায়। ভোক্তা অধিদফতর মাঝে-মধ্যেই অভিযান করলেও আবার সক্রিয় হয় তাদের দাম বৃদ্ধির সিন্ডিকেট।

কাকলি নামের এক নারী বলেন, পরিবারের গৃহস্থালির রান্নাঘরের জন্য কিছু আসবাবপত্র কিনেছি অফারে। কিন্তু আসলে তারা আমাকে ঠকিয়েছে। কারণ বাইরের দোকানে যেগুলো আসবাবপত্র দেখেছি আসলে সেগুলো না। নিম্নমানের পণ্য ধরিয়ে দিয়েছে আমাকে। এটা জাস্ট একটা প্রতারণা ক্রেতার সঙ্গে।

পুরান ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন ফারুক হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, মেলায় এসে শিশুদের জন্য করা শিশুপার্ক দেখে ভালো লাগলেও খাবার রেস্তরাঁগুলোতে খাবারের মান ভালো ছিল না। তারপরেও মেলায় দুপুর হয়ে যাওয়ায় খাবার খেতে হয়েছে পরিবার নিয়ে। নিম্নমানের খাবার চড়া দাম দিয়ে খেয়ে খুব খারাপ লাগলো। এসব বিষয়ে তদারকি করার জন্য ভোক্তা অধিকারের নজর দেওয়া উচিত। না হয় মেলায় আসার ইচ্ছে কমে যাবে মানুষের।

এদিকে বাণিজ্যমেলায় ক্রেতাদের অভিযোগ ও নানা অনিয়মের কারণে গত ২১ দিনে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৯৪ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জানুয়ারি একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার টাকা, ৯ জানুয়ারি ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা, ১০ জানুয়ারি দুই প্রতিষ্ঠানকে ৭ হাজার টাকা, ১১ জানুয়ারি দুই প্রতিষ্ঠানকে ৪ হাজার টাকা, ১৩ জানুয়ারি ৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১৯ হাজার টাকা, ১৪ জানুয়ারি ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৯ হাজার টাকা, ১৫ জানুয়ারি ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার টাকা, ১৭ জানুয়ারি একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩ হাজার টাকা, ১৮ জানুয়ারি দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা, ১৯ জানুয়ারি দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, সব দিকেই আমাদের নজর রয়েছে। কোনো রেস্তরাঁতে খাবারের চড়া দাম যাতে নিতে না পারে সে জন্য আমাদের মেলার প্যাভিলিয়নে ভোক্তা অধিকারের একটি টিম সবসময় নিয়োজিত রয়েছে। এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আসিফ আল আজাদ জানান, খাবারের দাম বেশি রাখা, দোকানে মূল্যতালিকা না রাখা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না করা, মিথ্যা লোভনীয় অফার দেয়া, খাবারের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া এবং ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে এই জরিমানা করা হয়। ভবিষ্যতেও এসব অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ইবিপি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর বাণিজ্যমেলার ২৬তম আসরে মোট ২২৫টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হলেও এ বছর দেয়া হয়েছে মোট ৩৩১ টি। যার মধ্যে ছোট বড় মিলিয়ে প্যাভিলিয়ন রয়েছে মোট ৫৭টি। এবারের মেলায় ভারত, পাকিস্তান, হংক, তুর্কিসহ অন্তত ১২টি দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। এ আসরে বাণিজ্যমেলার প্রধান ফটক করা হয়েছে মেট্রোরেলের আদলে। এই আসরে মেলার আয়তনও বাড়ানো হয়েছে অনেকটা।

বাণিজ্যমেলার ২৭তম আসর সফল করতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি কঠোরভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মেলায় প্রবেশ ফি ৪০ টাকা শিশু বাচ্চাদের জন্য ধরা হয়েছে ২০ টাকা। শারীরিক প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রবেশ ফ্রি করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে মেলার প্রতিটি অংশে।

মেলায় আগত দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে নানা রকমের পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে। মেলার প্যাভিলিয়নের বাইরে একপাশে সারি সারি সাজানো হয়েছে খাবার পরিবেশনের রেস্তরাঁ। তবে এসব রেস্তরাঁতে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করে চড়া দাম নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মেলায় আগত দর্শনার্থী ও ক্রেতারা।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ