ঢাকা, শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯, ১২ রজব ১৪৪৪

দৈনিক ২০০০ কোটি টাকা

প্রকাশনার সময়: ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮:২৫

যেখানে কোনো ব্যাংকের শাখা নেই-সেখানেও মিলছে ব্যাংকিং সেবা। নগদ টাকা জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, বিভিন্ন পরিসেবার বিল পরিশোধ ও রেমিট্যান্সের অর্থ গ্রহণ- সব সেবাই এখন পাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। আর এসব সেবায় বাড়তি চার্জও দিতে হচ্ছে না।

সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে এসব আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’। ঘরের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়ায় দিন দিন বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা, সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে আমানত ও ঋণের পরিমাণ। ৯ বছরে এই সেবা নিচ্ছে এখন ১ কোটি ৭২ লাখেরও বেশি গ্রাহক। আর প্রতিদিন লেনদেনও হচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাতের কাছে সেবা হওয়ায় গ্রাহকদের ঝামেলা কমছে। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা অল্প সময়ে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। বর্তমানে দেশে এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি গ্রাহক ও লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে। ব্যাংকগুলোতে ১৫ হাজারের বেশি এজেন্ট রয়েছে। দেশব্যাপী ২০ হাজার ৬০০টির বেশি আউটলেটে দেয়া হচ্ছে ব্যাংক সেবা।

এজেন্ট আউটলেটে গ্রাহক সহজেই তার বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুল স্পর্শ করে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারছেন। সহজে লেনদেন করাসহ বাড়ির কাছে ব্যাংক সেবা পাওয়ায় গ্রাহকের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাব বলছে, গত নভেম্বর মাস শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক ছাড়িয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার।

গত নভেম্বর পর্যন্ত এই সেবার আওতায় গ্রাহক আমানত হিসাবে জমা করেছেন ২৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। যা ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২৪ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। তিন বছর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল মাত্র ৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা। গত নভেম্বর মাসে ব্যাংকগুলো তাদের এজেন্টের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করেছে ৭৮৭ কোটি টাকা।

আলোচিত নভেম্বর মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এ হিসাবে দৈনিক গড়ে লেনদেন হচ্ছে ২ হাজার কোটি টাকার উপরে। এজেন্ট ব্যাংকিং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নভেম্বরে ব্যাংকগুলোর এজেন্টের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।

ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় সম্প্রতি অস্থিরতা দেখা দেয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবেও সার্বিকভাবে আমানত কিছুটা কমেছে। কারণ, এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় ইসলামী ব্যাংক অন্যতম অংশীদার। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় প্রভাব পড়েছে বেশি।

জানা যায়, বিশ্বের প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয় ব্রাজিলে। আর বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয় ২০১৪ সালে। এর আগে ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে দেশে প্রথম ব্যাংক এশিয়া পাইলট প্রকল্প হিসেবে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায় প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইসলাম শেখ ছিলেন দেশের প্রথম এজেন্ট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয় সাশ্রয়ী এ সেবায় গ্রাহক এজেন্ট আউটলেটে সহজেই তার বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের স্পর্শে হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। ফলে কম খরচে সহজে ব্যাংকিং সেবা পাওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ব্যাংকগুলোও এ সেবা প্রদানে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে আগামীতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে এমন ব্যক্তি এজেন্টশিপ নিতে পারবেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হয় ন্যূনতম এইচএসসি বা সমমান পাস। এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যেক এজেন্টের একটি চলতি হিসাব থাকতে হয়। এ সেবার মাধ্যমে ছোট অংকের অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়। তাছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় মুদ্রায় বিতরণ, ছোট অংকের ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং এককালীন জমার কাজও করা যায়।

উপযোগ সেবা বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ দিতে পারছেন এজেন্টরা। এছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ আবেদন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নথিপত্র সংগ্রহ করতে পারছেন এসব এজেন্ট।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, টাকা স্থানান্তর (দেশের ভিতর), রেমিট্যান্স উত্তোলন, বিভিন্ন মেয়াদের আমানত প্রকল্প চালু, ইউটিলিটি সার্ভিসের বিল পরিশোধ, বিভিন্ন প্রকার ঋণ উত্তোলন ও পরিশোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় সরকারি সব ধরনের ভর্তুকি গ্রহণ করা যায়। এজেন্টরা কোনো চেক বই বা ব্যাংক কার্ড ইস্যু করতে পারেন না। তারা বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত কোনো লেনদেনও করতে পারেন না। এছাড়া এজেন্টদের কাছ থেকে কোনো চেকও ভাঙানো যায় না। মোট লেনদেনের ওপর পাওয়া কমিশন থেকে এজেন্টরা আয় করেন।

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট নিয়োগ দেয় ব্যাংক এশিয়া। এরপর একে একে যুক্ত হয় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক। বর্তমানে কার্যক্রমে আছে ২৬টি ব্যাংক। যাত্রার আট বছরেই দ্রুতগতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এ সেবা।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ