ঢাকা, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

গফরগাঁওয়ে শীতল পাটির ভিন্নধর্মী হাট

প্রকাশনার সময়: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৮:২৪

চন্দনেরি গন্ধভরা, শীতল করা, ক্লান্তি-হরা। যেখানে তার অঙ্গ রাখি-সেখানটিতেই শীতল পাটি। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘খাঁটি সোনা’ কবিতায় শীতল পাটিকে বাংলার মাটির সঙ্গেই তুলনা করেছেন। এই শীতল পাটি একসময় ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার রাজপ্রাসাদেও স্থান পেয়েছিল বলে শোনা যায়।

পাটিগুলো সাধারণত ৭ ফুট বাই ৫ ফুট হয়ে থাকে। ডালা পাটি, রঙিন পাটি, বেতের পাটি, নামাজের পাটি, বোকাই পাটি ইত্যাদি নামে পরিচিত এসব শীতল পাটি।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানাধীন নিগুয়ারী ইউনিয়নের কুরচাই ও চাকুয়া নামে দুটি গ্রাম। পাটির জন্য বিখ্যাত বলে গ্রাম দুটি পরিচিতি পেয়েছে পাটিপল্লি বলে। গ্রামের পাশ দিয়েই এঁকেবেঁকে চলে গেছে কালী বানার নদী। এ নদীর তীরেই অবস্থিত নিগুয়ারী ইউনিয়নের কুরচাই ও চাকুয়া গ্রাম।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৮ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত সেই বানার নদী পাড়ের পাটিপল্লিতে গিয়েছিলাম সম্প্রতি সময়ে। ঘুরতে ঘুরতে দেখা মিলল শীতলপাটি বুননের কর্মযজ্ঞ। বুননকর্মীদের কাছে জানা গেল নানা কথা। সে কথায় ফুটে উঠল অতীত ঐতিহ্যের গর্ব।

গ্রাম দুটিতে শীতল পার্টি বুনিয়াদের বসবাস অনেক দিন আগে থেকে। প্রতিদিন ভোর থেকেই প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার শীতল পার্টি বুননের কাজ শুরু করার সাথে সাথে গ্রাম দুটিতে ভিন্নধর্মী হাট গড়ে উঠলেও বর্তমানে শীতল পার্টি শিল্পিদের এখন আর পূর্বের জৌলুস নেই। তাদের মাঝে নেমে এসেছে দুর্দিন।

আধুনিক প্রযুক্তির দাপট, ক্রেতা স্বল্পতা, আর্থিক সংকট, ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে গ্রাম দুটির শীতল পাটির শিল্পীরা এখন অনেকটা অস্বিত্ব সংকটে। এ অঞ্চলের পাটি শিল্পীরা এখন তাদের সাত পুরুষের পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এরপরেও কিছু মানুষ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে নাড়ির টানে ধরে রেখেছেন এই পেশাকে। ওই দুই গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে শীতল পাটি বুনে। এক সময় নিগুয়ারী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে শীতল পাটি বোনা হতো। কুরচাই ও চাকুয়া গ্রামের হিন্দু ধর্মালম্বী অন্ত পাঁচ শতাধিক পরিবার শীতল পাটি বোনার কাজে জড়িত ছিল। পুরুষের পাশাপাশি পাটি শিল্পী পরিবারের নারী ও শিশুরা পাটি বোনার কাজ করে থাকেন। গ্রাম দুটির প্রায় ১২ থেকে ১৪ একর জমিতে মোস্তাক চাষ হয়। এ সব মোস্তাক গাছ কেটে পাটি তৈরি করা হয়। বড় একটি পাটি বুনতে একজন কারিগরের অন্তত তিন দিন। আর ছোট পানি বুনতে দুই দিন সময় লাগে।

চাকুয়া গ্রামের পাটি শিল্পী সুমতি রানী দে (৫৪), অলকা রানী সরকার (৪২), অবলা রানী দে (৪৯), তাপশি রানী সরকার (৪৩), মনে রাখা রানী দে (৪৮), উত্তম চন্দ্র দে (২৯), স্বরসতী রানী সূত্রধর (৪০), ববিতা রানী দে (৪৬), গোপাল চন্দ্র দে (৬০), শ্যামল চন্দ্র দে (৪২) এরা সকলেই পাটি বুননের কাজ করে সংসার চালান। চাকুয়া গ্রামের গোপাল চন্দ্র দে (৬০) বলেন, একবার বীজ রোপন করলে এ মোস্তাক গাছ বড় হওয়ার পর ৬০ বছর পর্যন্ত বেত কাটা যায়।

পাটি শিল্পী শ্যামল চন্দ্র দে জানান, সাধারনত তার চার ধরনের পাটি তৈরি করে থাকেন। পিঠা পাটি, ডালা পাটি, শীতল পাটি ও বোকাই পাটি। একেকটি পাটি বিক্রি করে তাদের ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।

পাটি শিল্পিরা জানান, আগে ব্যবসা ভাল হতো। বর্তমানে প্লাষ্টিকের মাদুর ও পাটির জন্য আমাদের পাটির সেই চাহিদা নেই। এ অবস্থায় এখন আমাদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। পাটি শিল্পীদের অনেকে মায়ায় পড়ে এই পেশা আকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে মহাজনদের ঋনের চক্রে পড়ে সাত পুরুষের ভিটে মাটি বিক্রি করে দেশান্তরিত হয়েছেন।

পাটি শিল্পীরা জানায়, এ পেশায় টিকতে না পেরে ক্ষিতিশ চন্দ্র দে, প্রমোদ মিত্র, মনিদ্র চন্দ্র দে, জীবন চন্দ্র দে ও ভবেশ চন্দ্র সরকারসহ প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার ভিটেবাড়ি সহায় সম্পদ বিক্রি করে দেশান্তরিত হয়েছেন।

পাটি শিল্পীদের এ দুরবস্থা থেকে মুক্ত করতে সরকারি বেসরকারি সাহায্যে সহযোগিতার আশায় এ দুই গ্রামের পাটি শিল্পীর ২০০৭ সালে লোকনাথ শীতল পাটি উৎপাদনকারী শ্রমজীবি সমবায় সমিতি নামে একটি সমিতি গঠন করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন জায়গায় দারস্থ হয়ে কোন সাহায্যে সহযোগিতা না পাওয়ায় সমিতির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নিগুয়ারী ইউপি চেয়ারম্যান তাইজুদ্দিন মৃধা স্বীকার করে বলেন, বিগত সময়ে এই দুই গ্রাম থেকে প্রায় তিন শতাধিক পার্টি শিল্পী পরিবার দেশান্তরিত হয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবিদুর রহমান জানান, সম্প্রতি শীতল পাটিখ্যাত গ্রাম দুটি ঘুরে এসেছি। এ শিল্পকে ধরে রাখতে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

নয়াশতাব্দী/এফআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ