ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

গোলাপের গ্রাম সন্ধ্যাকুড়া

প্রকাশনার সময়: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৫:৩৭

শেরপুরের ঝিনাইগাতী সীমান্তের সন্ধ্যাকুড়া গ্রাম। গ্রামের পাশে গারো পাহাড়। পাহাড়জুড়ে নানা জাতের আগাছা, লতাগুল্ম আর বৃক্ষের আয়োজন। আশপাশের জমিগুলো পতিতই পড়ে আছে বলা যায়। এর মধ্যে এই পাহাড়ে বাহারি গোলাপের বাণিজ্যিক চাষ করে সবাইকে চমকে দিলেন মোহাম্মদ আলী। প্রায় ১৫০ শতাংশ জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন তিনি। এটি জেলায় গোলাপের প্রথম বাণিজ্যিক চাষ।

মোহাম্মদ আলীর গোলাপ বাগান অনেকের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। পতিত জমি ফিরে পেয়েছে ফসলের সুঘ্রাণ, গোলাপের আতর সুভাস। যুবকেরা পেয়েছে কর্মসংস্থান। তার কাজে খুশি স্থানীয় কৃষি বিভাগ। গ্রামের লোকেরা বললেন, ‘মোহাম্মদ আলী তো আমাদের নতুন পথ দেখাল।’

সরেজমিনে একদিন

এক বিকালে গেলাম গোলাপ বাগানে। মোহাম্মদ আলী হাসিমুখে স্বাগতম জানালেন। প্রথমে বাগানে ঢু মারলাম। অবাক বনে গেলাম। দেখি, এখানে শোভা ছড়াচ্ছে সাদা, লাল, হলুদ ও পিংক কালারের বাহারি গোলাপ। জানালেন, ফুলের এখন ৭ মাস। তিনি গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন। ‘১৫ বছর ঢাকায় ছিলাম। শাহবাগ, উত্তরা, ধানমন্ডি এবং গুলশানে নানা ধরনের ফুলের ব্যবসা করেছি। মন পড়ে থাকত গ্রামে। ঠিক করলাম, গ্রামের বনাঞ্চলে পড়ে থাকা জমিতে গোলাপ চাষ করব। একদিন জমিও লিজ নিয়ে নিলাম। মালিককে আট বছরের জন্য দিলাম সাড়ে তিন লাখ টাকা। নাম রাখলাম ‘জননী ফ্লাওয়ারস গার্ডেন’।

যেভাবে শুরু

ব্যবসা শুরু করবেন, কিন্তু হাতে তেমন টাকা নেই। অল্প টাকা ছিল। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেন ১৯ লাখ টাকা। ভারতের এক বন্ধুর মাধ্যমে দুই দফা চাইনিজ ও থাই জাতের ১৮ হাজার গোলাপের চারা সংগ্রহ করেন। খুব ঘটা করে চারা রোপণ করেন। লোকে বলল, ‘মোহাম্মদ আলী আবার কী শুরু করল!’ মোহাম্মদ আলী মাত্র ৬ মাসে বাগান থেকে ৪ লাখ টাকা আয় করেছেন। মানুষ দলবেঁধে এখন বাগান দেখতে আসে।

গোলাপের ভরা মৌসুম শীত। গোলাপ চারার যত্নও নিতে হয় সময়ে সময়ে। জৈব সার, টিএসপি ও ইউরিয়া দিতে হয়। চারা রোপণের এক মাস পর ফুল আসে গাছে। চার মাস পর ফুল বিক্রি করা যায়।

ভয় পেয়েছিলেন, থেমে যাননি

তখন ফুলের দুই মাস। বর্ষা মৌসুম শুরু হয়। হঠ্যাৎ পাহাড়ি ঢলে বাগানে বন্যা হানা দেয়। বেশ ক্ষতি হয়েছিল সেবার। আবার ধারদেনা করেন। বললেন, ‘বাগানের বয়স এক বছর হলে ভালো লাভবান হব। সুদিন ফিরবে আমার।’

মোহাম্মদ আলী এখন ভয় করছেন বন্যহাতির। এই সময়ে পাহাড়ি অঞ্চলে বন্যহাতির আনাগোনা বেড়ে যায়। হাতির দল যে দিক দিয়ে যায়, সেখানের ফসল পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে ফেলে। বললেন, ‘বন্যহাতির কবলে আমার আর রক্ষা নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা এদিকে নজর দিলে বড় ভালো হয়।’

এবার তারা বেজায় খুশি

বাগানে কাজ করেন কুসুম আলী ও ফজলুর রহমান। তারা সকাল-সন্ধ্যা নাগাদ বাগানে থাকেন। আগাছা পরিস্কার, ফুল কাটিং, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পাইকারদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের। তারা প্রতি মাসে মাইনে পান ১৪-১৬ হাজার টাকা। কখনোসখনো দৈনিক চুক্তিতে শ্রমিকও নিতে হয় তার। ‘আমাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে গোলাপ বাগান।’ বললেন কুসুম আলী।

স্থানীয় পাইকার মোকছেদ মিয়া বলেন, ‘উৎপাদিত গোলাপ স্থানীয় বাজার ছাড়াও ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় বিক্রি হচ্ছে। দৈনিক গড়ে প্রায় দুই হাজার পিস ফুল সংগ্রহ করা হয়। একটি ঝুড়িতে থাকে ১০০ পিস। যার বিক্রয় মূল্য ২ থেকে ৪ হাজার টাকা।’

জমি লিজদাতা মনজুর মিয়া বলেন, ‘মোহাম্মদ আলীর সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই গোলাপ বাগান তৈরি করতে আগ্রহী হচ্ছেন। তার আরও কিছু পড়ে থাকা জমি অন্য যুবকরা ভাড়া নিয়ে বাগান করতে চাইছে।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন দিলদার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে। আমরা সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এখানে স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আলী গোলাপ বাগান করেছেন। উচ্চ মূল্যের ফসল গোলাপ আবাদ ছড়িয়ে দিতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।’

নয়া শতাব্দী/আরআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ