রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

১৭ বছরেও পূর্ণতা পায়নি ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লী

প্রকাশনার সময়: ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ২১:২৮

প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে উদ্বোধনের ১৭ বছরেও পূর্ণতা পায়নি পাবনার ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লী। পল্লীর অভ্যন্তরে টিনের চাল দিয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে মাত্র সাতটি তাঁত কারখানা বসানো হয়েছে।

বেনারসি পল্লী সূত্রে জানা গেছে, উত্তরবঙ্গে কর্মরত কয়েক হাজার বেনারসি তাঁতির অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা এবং তাঁতশিল্পের প্রসারের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ঈশ্বরদীতে বেনারসি পল্লী স্থাপনের জন্য নব্বইয়ের দশকে একটি পরিকল্পনা হাতে নেয়। ২০০০ সালে প্রকল্পের অধীনে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের আওতায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ঈশ্বরদীর হতে মোহাম্মদপুরে পাঁচ দশমিক শূন্য পাঁচ একর জমি অধিগ্রহণ করে বেনারসি পল্লী প্রতিষ্টা করা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ, পানি, মসজিদ, নিরাপত্তাবেস্টনীসহ বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে তাঁতিদের জন্য বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা করা হয়। ২০০৪ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকল্পের উদ্বোধন করেন ততকালীন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী শাজাহান সিরাজ।

বেনারসি পল্লীতে মোট ৯০টি প্লটের মধ্যে উদ্বোধনের দিন ৫৯টি প্লটের দলিল তাঁতিদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। তাঁত বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী পৌর সভার থেকে প্লান করে নিচে কারখানা, তার উপরে দোতালায় অফিস ও আবাসিক ব্যবস্থা সম্বলিত স্থায়ী কারখানা করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেনারসি পল্লীতে প্রকল্পের নিয়ম ও নকশা অনুযায়ী একটি কারখানাও গড়ে ওঠেনি। শুধুমাত্র নজরুল ইসলাম নামে এক তাঁতি প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী কারখানা শুরু করেছেন বলে অফিস জানায়।

তাঁতিরা বলেন, বেনারসি পল্লীর কার্যক্রম জোরদার করতে তাঁত বোর্ডের কাছে কয়েকটি দাবি বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান তারা। দাবি গুলোর মধ্যে ছিল, ২০ বছর মেয়াদি ২৪০টি সহজ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য সুদমুক্ত লোন প্রদান, সরকারি অর্থায়নে প্লটের উপর কারখানা ও আবাসন নির্মাণ, তাঁতিদের জন্য একটি নিজস্ব মৌলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং ঈশ্বরদীতে একটি ক্যালেন্ডার মেশিন স্থাপন।

ঈশ্বরদীর পৌর প্রাথমিক বেনারসি তাঁতি সমিতির এ্যাডহক কমিটির আহ্বায়ক ও পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো: ওয়াকিল আলম দৈনিক নয়া শতাব্দীকে জানান, টাকা-পয়সার অভাবে তাঁত টিকিয়ে রাখা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী কারখানা তৈরিতে প্রচুর অর্থ খরচ হবে। তাই নকশা বাদ রেখে টিনশেড কারখানা তৈরি করছেন। তাঁতিরা অর্থ সংকটের কারণে স্থায়ী কারখানা নির্মাণ করতে পারছেন না।

এমনকি লোনের কিস্তি পরিশোধও তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। করোনার কারণে ২ বছর তাঁতিরা ব্যবসা করতে পারেননি। অর্থ ও শ্রমিক সংকটের কারণে তার ১২টি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে শ্রমিকরা নির্মানাধীন রুপপুর প্রকল্পে কাজ করছেন। সেখানে তারা মাসে বেতন পায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, ফলে অপেক্ষাকৃত কম মজুরীতে তাঁত শ্রমিক মিলছে না। তাছাড়া ভারতীয় শাড়ির কারণে আমাদের শাড়ির চাহিদা কমে যাচ্ছে। তিনি তাঁতিদের সুদমুক্ত লোন ও বেনারসি পল্লীতে সিকিউরিটি গার্ড দেয়ার দাবি করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থায়ী কারখানা না হওয়ায় পল্লীর অভ্যন্তরে বেশির ভাগ অংশ জঙ্গলে ভরে গেছে। যেটুকু খালি আছে সেখানে ছেলেরা খেলাধুলা করছে। জামাল টেক্সটাইল নামে একটি কারখানায় বিপু, রাসেল, ফিরোজ, পিয়াস ও টুকন নামে কয়েক জন শ্রমিক তাঁতে শাড়ি তৈরির কাজ করছে।

তারা জানান, এখানে ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা দামের শাড়ি তৈরি হয়। একটি শাড়ি বুনতে একজন শ্রমিকের ৫-৭ দিন সময় লাগে। একটি শাড়ি তৈরি করে শাড়ির কোয়ালিটি অনুয়ায়ী তারা মজুরী পান ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা । এত কম মজুরি দিয়ে তাদের সংসার চলে না। তাই বেশির ভাগ তাঁত শ্রমিক তাঁতের কাজ বাদ দিয়ে রিকসা, ভ্যান চালায় বা অন্য পেশায় চলে গেছে।

বেনারসি পল্লীর ভেতরে নাসিম বেনারসি টেক্সটাইল নামের কারখানায় ১৩টি তাঁতের মধ্যে মাত্র ৪টি তাঁতে আব্দুর রহমান, শামীম, রাজু ও ভুট্রো নামের ৪ শ্রমিক তাঁতে শাড়ি বুনাচ্ছে। ভারতীয় শাড়ি এসে শ্রমিকের মজুরি কম হওয়ায় শ্রমিক সংকট প্রভৃতি কারণে আমাদের শাড়ি চলছে না। ফলে অনেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

তারা জানান, কালেভদ্রে প্রয়োজনে ঢাকা থেকে তাঁত বোর্ডের দুই-একজন কর্মকর্তা ঈশ্বরদীতে পরিদর্শণে আসেন। একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আছেন। আর কোন ষ্টাফ নেই। তেমন কোনো কাজ না থাকায় অলস সময় কাটে তার।

ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার ওবাইদুর রহমান জিলানি বলেন, ‘প্রকল্পের নকসা অনুযায়ী স্থায়ী কোন কারখানা গড়ে ওঠেনি বেনারসি পল্লীতে। তবে নজরুল ইসলাম নামে একজন তাঁতি সম্প্রতি প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী কারখানা নির্মাণ শুরু করেছেন। ঢাকার তাঁত বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে এখানকার তাঁতিরা টিনশেডের ঘর করে ৭টি অস্থায়ী কারখানা চালু রেখেছেন। ঈশ্বরদী তাঁতি সমিতি ১৯৯৩ সালে রেজিষ্টেশন পায়।’

তিনি জানান, ১৯৯৯ সালে সর্বোচ্চ ৫ টি তাঁতের উপর প্রত্যেক তাঁতিকে বিনা সুদে শুধুমাত্র সার্ভিস চার্জ বাবদ ২ হাজার ৭৭৫ টাকা করে নিয়ে ৩৬ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ১৮ হাজার টাকা করে মোট ৬৪ জন তাঁতিকে মোট ১১ লাখ ৫২ হাজার টাকা লোন প্রদান করা হয়েছে। এই লোনের বেশির ভাগই আদায় হয়েছে, মাত্র ৪ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।

তিনি আরো জানান, এরপর থেকে তাঁতিদের আর কোনো লোন বিতরণ করা হয়নি। তবে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে চলতি মুলধন সরবরাহ ও তাঁতের আধুনিকায়ণ প্রকল্পের আওতায় যে সমস্ত তাঁত সচল আছে তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তাঁতি বাছাই সম্পন্ন হলে অচিরেই তাঁতি প্রতি ৬০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত শুধু সার্ভিস চার্জ নিয়ে লোন দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই এই লোনের জন্য ৩৩ জন তাঁতি আবেদনও কছেন বলে তিনি জানান।

বেনারসি পল্লীতে ১৭ নম্বর প্লটের মালিক তাঁতি বাদল বেনারসি দৈনিক নয়া শতাব্দীকে জানান, বেনারসি পল্লীতে প্লট নিয়ে কারখানা করলে সরকার সহযোগিতা করবে এই আশায় সেখানে প্লট বরাদ্দ নেন তিনি। কিন্তু সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি পল্লীতে কারখানা করতে পারেননি। বেনারসি পল্লীতে নিয়ম অনুযায়ী একটি কারখানা করতে ন্যূনতম ২০ লাখ টাকা খরচ হবে। এই অর্থ যোগান দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তাঁতি আসিফ বেনারসি বলেন, ‘করোনায় কারণে তারা দিশেহারা। করোনাকালীন সময় দোকান বন্ধ রেখে দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছে। অর্থ সংকটের কারণে তার বেশ কয়েকটি তাঁত বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে তার ৭টি তাঁত সচল আছে। করোনার পর নতুন করে কারখানা রানিং করা হচ্ছে।’

ক্ষুদ্র লোনের তাঁতি নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক ও ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার পি.এম. ইমরুল কায়েস বলেন, ‘৩৩ জন তাঁতিকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। অনুমোদনের পর তাঁরা লোন পাবেন।’

নয়া শতাব্দী/জিএস/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ