ঢাকা, সোমবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯, ৭ রজব ১৪৪৪

দুশ্চিন্তায় বিএনপি!

প্রকাশনার সময়: ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮:২৮

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে জোর প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ওই নির্বাচন সামনে রেখে ‘সরকার পতন’ আন্দোলন দ্বিতীয় ধাপে দলটি। ঢাকাসহ ১০ বিভাগীয় গণসমাবেশের মধ্য দিয়ে আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা। কিন্তু হঠাৎ করেই আন্দোলনের ছন্দ যেন কিছুটা হারিয়েছে। উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা খানিকটা ঘুমিয়ে পড়েছে।

টানা ৬ মাস ধরে গণমিছিল, গণঅবস্থান বা বিক্ষোভ সমাবেশের মতো গতানুগতিক কর্মসূচিতে রাজপথে সরব থাকলেও এখন খানিকটা নিস্তেজ-স্থবির। ছন্দপতন ঘটেছে রাজধানী ঢাকার আন্দোলন। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছে বিএনপি। ঢাকার আন্দোলনকে ফের বেগবান নয়া কৌশলে এগোচ্ছে বিএনপি।

বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন, বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপির আন্দোলন প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু ঢাকায় এসে সেটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। যে কারণে বরাবরের মতো ঢাকার আন্দোলন নিয়ে আবারও দুশ্চিন্তায় পড়েছে বিএনপি। আর তাই রাজধানীতে আন্দোলন নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছে দলটি।

এর জন্য দায়ী দলীয় পদ-পদবি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়াকে কেন্দ্র করে। দলের ভেতরে এই সংকট দূর করতে নতুনভাবে কাজ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। একই যুগপৎ আন্দোলনে শরিকদের মনোবল দৃঢ় করতে নানা ইস্যুতে তাদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে।

তারা বলছেন, ঢাকায় আন্দোলনের বিকল্প নেই। ঢাকায় আন্দোলন যত বেশি জোরদার হবে সরকারের ‘কনসার্ন বডি’ তত বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হবে। আর তখনই সরকার বিএনপির দাবি-দাওয়া মানতে নমনীয় হবে। তাই এখন বিএনপির মূল টার্গেট ঢাকায় আন্দোলন করা।

নির্ভরযোগ্য দলীয় সূত্রমতে, সরকার পতনসহ ১০ দাবি আদায়ে চলমান আন্দোলনকে দুই ধাপে চূড়ান্ত রূপ দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। যাতে বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি হলেও রাজপথ ছেড়ে দিতে না হয় এজন্য কর্মসূচিকে দুই ভাগ করে সাজানো হচ্ছে। একইসঙ্গে নেতাকর্মীরাও যেন ক্লান্ত হয়ে না পড়ে।

প্রথম ধাপে থাকছে— বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশের মতো কর্মসূচি। যা চলমান রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত চলবে এই কর্মসূচি। দ্বিতীয় ধাপে— হরতাল, অবরোধ, সচিবালয় ঘেরাও, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওসহ অন্যান্য শক্ত কর্মসূচি থাকবে।

প্রথম ধাপের কর্মসূচি ছুটির দিন দেয়া হবে। পাশাপাশি কর্মসূচি ঘোষণার সময় বিএনপির ঘোষিত ১০ দফা দাবির সঙ্গে চলমান জনসম্পৃক্ত ইস্যুকে যুক্ত করা। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের আশ্বস্ত করা এবং তাদের কাছে থেকেও আশ্বস্ত হওয়া।

একই সঙ্গে যেসব ছোট দলের নেতারা মনে করেন, তারা ভোটে জয়ী হয়ে সংসদে যেতে পারবেন না, তাদের মনোনয়ন দিয়ে সংসদে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েও আন্দোলনে নামানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে বিএনপি। দলের মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা নেতাদেরও আন্দোলনে সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

এছাড়া দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে যে কমিটিগুলো অভ্যন্তরীণ কোন্দলে লিপ্ত, সেই কমিটিগুলো ভেঙে দেয়া অথবা তাদের দেখভালের জন্য কয়েকজনকে দায়িত্ব দেয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো মধ্যে বর্তমানে বেশি অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে ছাত্রদলে। আবার অনেকে ছাত্রদলকে দলীয় স্বার্থকে বাদ দিয়ে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে। যার কারণে দীর্ঘ ৭ বছর পর রকিবুল ইসলাম বকুলকে ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে। যাতে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন করে তাদের রাজধানীর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলন নিয়ে বিএনপির অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই বাইরে চলে যাচ্ছে। বিএনপির হাইকমান্ডের ধারণা দল ও জোটের নেতারাই এগুলো বাইরে ফাঁস করে দিচ্ছে। তাই আগামীতে আন্দোলন নিয়ে নেয়া পরিকল্পনাগুলো গণহারে সবাইকে না জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের মধ্যে গোপন রেখে বাস্তবায়ন করারও একটা সিদ্ধান্ত আছে।

জানতে চাইলে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, ৬ দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। এর মধ্যে আমাদের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ছিল দুটি, তাই ছাত্রদলের সমস্যাগুলো নিয়ে বসা হয়নি। আশা করি, আগামী কিছুদিনের মধ্যে ছাত্রদলের প্রতিটি ইউনিটের সঙ্গে বসব, তাদের সমস্যাগুলো শুনব। সেই অনুযায়ী সমাধানও করার চেষ্টা করব।

বিএনপির মধ্যম সারির দুই নেতার মতে, স্থায়ী কমিটিতে এখনও সমস্যা রয়ে গেছে। আবার অনেক নেতার কার্যক্রম আন্দোলনের চাইতে নির্বাচনকেন্দ্রিক ও অনেকের রাজনীতি পদ-পদবি পাওয়াকে কেন্দ্র করে। আগে এগুলো সমাধান করতে হবে, নইলে সরকার পতনের আন্দোলন কখনোই জমবে না। আন্দোলনের সফলতা তখনই আসবে, যখন রাজনীতিতে আন্দোলনের ভিত মজবুত হবে। দলের মধ্যকার সমস্যা সমাধান করে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপির আন্দোলনে এখন সাধারণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আগামীতে আরও বাড়বে। আশা করছি, ধীরে ধীরে ঢাকায় আন্দোলন জমে উঠবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের কার্যক্রমও চলমান আছে।

ঢাকাতে বিএনপির আন্দোলনের ছন্দপতনের বিষয়টি মানতে নারাজ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, ঢাকায় আন্দোলনের কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। আন্দোলন কখনও তুঙ্গে উঠবে, আবার কখনও ঢিলে হবে— এটাই হলো আন্দোলনের ধরন। আস্তে আস্তে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। কঠোর কর্মসূচি আসবে। এটাই আন্দোলনের নিয়ম।

আন্দোলনের নতুন পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে টুকু বলেন, আমাদের স্থায়ী কমিটিতে কী আলোচনা হয়েছে, সেটা তো আমি বলতে পারব না। এটা দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা নিয়ে কথা বলা যাবে না।

আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, সাময়িকভাবে আন্দোলনের গতি কিছুটা ধীরে চললেও সামনের দিনে তা বাড়বে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ থেকে নেতাকর্মীরা যেন বিচ্যুত না হয়; সেদিকে খেয়াল রেখে সতর্কতার সঙ্গে আমাদের কর্মসূচিগুলো দিতে হচ্ছে। তবে সরকার পতনের কঠোর কর্মসূচি অবশ্যই আসবে। গ্রেফতার এড়ানোর পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের মুক্তির জন্যও নতুন কৌশলে মাঠে থাকবে বিএনপি।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ