মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জামিনের জঙ্গিরা মাথাব্যথা

প্রকাশনার সময়: ২৪ নভেম্বর ২০২২, ০৮:২২

জামিনে মুক্ত থাকা জঙ্গিরাই এখন মাথা ব্যথার কারণ হয়েছে। কারণ গত রোববার আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়ার নেতৃত্ব দেয় জামিনে থাকা ৮ জঙ্গি। এদের মধ্যে মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে ছিনিয়ে নেয়া জঙ্গিদের এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত তদারক সূত্র মতে, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অমি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। জামিন নিয়ে লাপাত্তা জঙ্গিরাই এখন নানাভাবে সক্রিয়।’ তারা আরও বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।’

কঠোর নিষিদ্ধ থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোবাইল ব্যবহার করছে হাজতিরা। এমনকি সেলের ভেতরেই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা কথা বলতে পারছেন বাইরে থাকা অন্য সহযোগীদের সঙ্গে। ঢাকার আদালত থেকে ছিনতাই ঘটনার আগে কারাগারে ছিনতাই হওয়া জঙ্গিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। কখন তাদের আদালতে নেয়া হবে সেই সময়ও জেনে যায় সহযোগীরা। ২ জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার পর গ্রেফতার হওয়া অন্য জঙ্গিদের কাছ থেকে এসব তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এমন পরিস্থিতিতে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিসি ক্যামেরার ফুটেজগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) ও দুজন জ্যেষ্ঠ জেল সুপারকে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান জানান, জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়া চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে আগেই জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। এ কারণে জামিনে থাকা জঙ্গিদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন জানান, সম্প্রতি যেসব জঙ্গি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়েছে তাদের আমরা গ্রেফতার করেছি। আরও বেশ কয়েক জঙ্গি র‍্যাবের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তাদেরও আমরা আইনের আওতায় আনতে পারব বলে আশা করছি। এই মুহূর্তে র‍্যাবের গোয়েন্দা তথ্যমতে, জঙ্গিদের আক্রমণাত্মক হওয়ার সামর্থ্য নেই। তিনি জানান, র‍্যাব বহুমুখী কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দমন কার্যক্রমে কাজ করছে। যখনই জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে, তখনই গ্রেফতার করা হচ্ছে। শুধু অভিযান নয়, জঙ্গিবাদবিরোধী জনমত গড়তে র‍্যাব ব্যাপক প্রচার চালিয়েছে। জানা গেছে, গত চার বছরে সব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের ৬১০ জন জামিন পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে আনসার আল ইসলামের ৬৬ জন। আবার এই ৬৬ জনের মধ্যে ৩০ জন আত্মগোপনে রয়েছে। আনসার আল ইসলামের (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটি) এই আতঙ্কের মধ্যেই গোয়েন্দাদের মাথাব্যথার কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া।

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় দুর্গম পাহাড়ে থাকাবস্থায়ই তাদের বিষয়ে খোঁজ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে এই সংগঠনের ২৯ জনকে গ্রেফতার করেছে এলিট ফোর্স র‍্যাব। এরই মধ্যে ১৯ জেলার ৫৫ জন তরুণ নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব। ঘর পলাতক ও জামিন নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া জঙ্গিরাই এখন মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্ত তদারক একাধিক সূত্রমতে, গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে জঙ্গিদের আদালতে আনা-নেয়ার পুরো রুট (পথ) সম্পর্কে হামলাকারীরা অবগত ছিলেন। সেদিন আদালতে আনা ১২ জঙ্গির মধ্যে ৪ জঙ্গি কীভাবে আলাদা হবেন, সেই নির্দেশনাও তাদের আগে থেকেই দেয়া হয়েছিল। যে দুজনকে ছিনিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি তারা হলেন— আরাফাত রহমান ও আবদুস সবুর রাজু ওরফে সাদ ওরফে সুজন। আরাফাত রহমান ও আবদুস সবুর সিটিটিসির জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, ‘কারাগারে থেকেও তাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল বাইরে থাকা আনসার আল ইসলামের আসকারি (সামরিক) শাখার জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে। এটি সমন্বয় করছিলেন আসকারি শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতা আয়মান ওরফে মশিউর রহমান। জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এই আয়মানও জামিন নিয়ে লাপাত্তা রয়েছে। কারাগারে বসেই জঙ্গিরা জামিন নিয়ে পলাতকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন।

সিটিটিসি সূত্র বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে আরাফাত ও সবুর স্বীকার করেছেন, কারাগারের ভেতরেই তারা মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারতেন। তাদের দেয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ ওঠার পর তিন কারা উপমহাপরিদর্শক ও দুই সিনিয়র জেল সুপারকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক এ কে এম ফজলুল হককে ঢাকা বিভাগে, রংপুর কারা উপমহাপরিদর্শক আলতাব হোসেনকে চট্টগ্রাম বিভাগে এবং ঢাকা বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ তৌহিদুর হককে রংপুর বিভাগে বদলি করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠ জেল সুপারের মধ্যে হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার আবদুল জলিলকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার সুব্রত কুমার বালাকে হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বদলি করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত এক জঙ্গিকে গ্রেফতর করতে পারলেও ছিনিয়ে নেয়া ২ জঙ্গিকে এখনও আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ কর্তারা একই কথা বলছেন, ‘ওই ২ জঙ্গি আমাদের জালে আছে। যে কোনো সময় তাদের গ্রেফতার করা হবে।’

সূত্র জানায়, ‘পরিচয় গোপন করে জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিরা দেশের ভেতরেই অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদের বেশিরভাগ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থেকে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। আবার কেউ দেশের বাইরেও পালিয়ে গেছেন। দেশে ৬৮ কারাগারে কমপক্ষে সাত হাজার জঙ্গির আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’

একাধিক সূত্র বলছে, বিভিন্ন সময় জামিন নিয়ে পলাতক ২৭২ জঙ্গি। তাদের সন্ধানে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক ইউনিট। ধারণা করা হচ্ছে— পরিচয় গোপন করে বেশিরভাগই দেশের ভেতর অবস্থান করছে। আবার কেউ দেশের বাইরেও পালিয়ে গেছে। এরই মধ্যে তাদের ধরতে পুলিশের ইউনিটগুলো রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। যেভাবেই হোক তাদের ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে পুলিশ সদর দফতর থেকে। এমনকি বিশ্বের সর্বোচ্চ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ওই সব জঙ্গিকে শনাক্ত করে সতর্কতা জারি করতে অনুরোধ জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করেন এমন কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে আনসার আল ইসলাম। আগে এই সংগঠনটির নাম ছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)। ২০১৫ সালে এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তখন থেকে আনসার আল ইসলাম নামে কার্যক্রম চালায় এর সদস্যরা। পরে ২০১৭ সালে সরকার আনসার আল ইসলামকেও নিষিদ্ধ করে।

গত ২০ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকার সিএমএম আদালতে শুনানি শেষে প্রিজন ভ্যানে তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান ও আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে শাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাবকে ছিনিয়ে নেন তার সহযোগী জঙ্গিরা। ছিনিয়ে নেয়া দুই জঙ্গি ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৩১ নম্বর জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে সারাদেশে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে পুলিশ সদর দফতর।

নয়া শতাব্দী/আরআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ