মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় সরকারের ব্যর্থতা : বিএনপি

প্রকাশনার সময়: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০:৩৫

জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণ ‘সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা’ বলে মনে করছে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, মঙ্গলবার দুপুর থেকে প্রায় আট ঘণ্টা টোটাল ব্লাক আউট ছিল। অথচ দুর্নীতি করার জন্য সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের নাম করে বহু প্রজেক্ট করেছে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুত বিপর্যয় আওয়ামী মডেল অব ইকোনমী’র প্রতিফলন। আগামী দিনে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে বিদ্যুখাত উন্নয়নের সাথে সাথে ট্রান্সমিশন ও ডিসট্রিবিউশনটাও সমন্বয় করা হবে বলেও জানিয়েছে দলটি।

বুধবার (৫ অক্টোবর) এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির নেতারা জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ে দুপুর থেকে ৮ ঘণ্টা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অধিকাংশ জেলায় বিদ্যুতহীন অবস্থায় থাকার বিষয়ে এসব কথা বলেন।

এর আগে দুপুরে আসাদ গেইটে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অসুস্থ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে দেখতে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরে সেখানে বিদ্যুত বিপর্যয় নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন তারা।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা মনে করি, জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা। যে কথাটা আমাদের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী টুকু বললেন, এখানে যে পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এবং যে কাঠামোগত ব্যাপারটা থাকে অর্থাৎ টেকনিক্যাল সাইড যেটা থাকে সেখানে টোটালি চুরি হয়েছে বলেই আজকে এই বিপর্যয় ঘটেছে।

তিনি বলেন, এই ঘটনা শুধু বিদ্যুতে নয় সর্বক্ষেত্রেই ঘটছে। যার ফলে আজকে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য মূলত দায়ী সরকারের অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রজেক্ট গ্রহণ করা, বিভিন্ন উন্নয়নের প্রকল্প করা যার লক্ষ্য হচ্ছে দুর্নীতি।

লোডশেডিং প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার এত চিৎকার চেঁচামেচি করছে, সবসময় বলছে- আমরা বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছি! বলা হচ্ছে- প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন আরো বেশি হচ্ছে। তবুও সারাদেশে প্রায় ৮ ঘন্টা বেশিরভাগ জায়গাতে এই লোডশেডিং চলে।

তিনি বলেন, এর থেকে বোঝা যায়, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের নাম করে বহু প্রজেক্ট করেছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে এ ধরনের একটা বড় রকমের দুর্যোগের মধ্যে, বিপর্যয়ের মধ্যে জাতিকে তারা ফেলে দিয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় নেট বন্ধ হয়েছে, কলকারখানা বন্ধ ছিল; ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ ছিল। সন্ধ্যার আগে যে কৃষি ক্ষেতে সেচের ব্যবস্থা করা হয় তাও বন্ধ হয়েছিল। তথাকথিত উন্নয়নের নামে সরকারের দুর্নীতির কারণে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা হচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো- কোথাও তো কোনো জবাবদিহিতা নাই। দেয়ার ইজ নট ইলেক্টেড পার্লামেন্ট। এই সরকারের জনগণের প্রতি কোনো দায় নেই, দায়িত্বশীলতার ব্যাপার নেই। তাদের জবাবদিহিতার অভাবের কারণে এই সব ঘটনা ঘটছে। এই সরকার এখন একটা বারডেন হয়ে গেছে দেশের ওপরে, তারা একটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সরকারকে না সরালে এই জাতির অস্তিত্বই টিকে থাকা মুশকিল হবে। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই রাস্তা- দে মাস্ট রিজাইন এবং একই সঙ্গে একটা কেয়ারটেকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এছাড়া এর কোনো বিকল্প পথ নেই।

২৯ প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না দেওয়ার ব্যাপারে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে- এ বিষয়ে ফখরুল ইসলাম বলেন, এটা ভয়াবহ ব্যাপার। আমরা যে বলছি, কতৃত্ববাদী সরকার এখন আর কোনো ফাঁক রইল না। স্বয়ং রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে যদি এই সার্কুলার আসে তাহলে এই দেশে যে পুরো কৃর্তত্ববাদী হয়ে গেছে সেটা আর সন্দেহ নেই। আমরা এই সার্কুলারের তীব্র নিন্দা এবং এটা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।

সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সারাদেশে যে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো রয়েছে সেগুলো ইউনিভাইড স্পেসিফিকেশনে দেয় নাই। যার ফলে কোনো পাওয়ার স্টেশন খুব নিউ জেনারেশনের আবার কোনটা পুরনো। এদের মধ্যে সিনকোনাইজড করা সম্ভব না। বিদ্যুৎ যে শুধু জেনারেশনে চলে না, ট্রান্সমিশনে লাগবে, ডিসট্রিবিউশনে লাগে- এগুলোর কিন্তু খুব একটা উন্নতি হয় নাই। খালি বিদ্যুৎ প্রকল্প বানিয়েই গেছে। বানিয়ে যাওয়ার ফলে আজকে যেটা হয়েছে। এটা আরো হবে ভবিষ্যতে। কারণ সিনট্রোনাইজ করে নাই।

তিনি বলেন, রেন্টাল পাওয়ার যেগুলো আছে এগুলো পুরনো মেশিন। পুরোনা মেশিন আর নতুন যেগুলো আছে- সেগুলো এক না। কোনো না কোন সময় দেখা যাবে একটা ক্লিপ করলে সবগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। সিনট্রোনাইজড করতে পারবে না। কারণ নতুনটার সাথে পুরনোটার সিনট্রোনাইজড করা যায় না। লুটপাট করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাওয়ার স্টেশন দিয়েছে, সেই পাওয়ার স্টেশনের স্পেসিফিকেশনগুলো কি, প্রসিডিউরগুলো কি, এটা একটার সাথে আরেকটা ম্যাচ করবে কিনা এসব বিবেচনা করে নাই। যার ফলে আমরা দেখলাম ৮ ঘন্টা বিদ্যুৎ নাই।

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন কিভাবে করবে জানতে চাইলে ইকবাল হাসান টুকু বলেন, আমরা একবারে প্রাইভেটাইজেশন জেনারেট করা যাবে না। করলে সাধারণ মানুষের জন্য প্রাইজ করা কঠিন হয়ে যাবে। আমরা মিক্সড করবো।

তিনি বলেন, আমাদের পলিসি ছিল ৩০% বেসরকারি এবং ৬০% সরকারে থাকবে- এভাবে আমরা বিদ্যুতের উন্নয়ন করব। এই উন্নয়নের সাথে সাথে ট্রান্সমিশন ও ডিসট্রিবিউশটাও সমন্বয় করে করব। যাতে সমস্যা না হয়।

টুকু বলেন, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন প্রজেক্ট নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি। এ কারণে জনগণের দুর্ভোগ লাঘব হয়নি। সরকার অপরিকল্পিত ভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছে। এই বিপর্যয় আরও হবে। সরকার যে ধরনের প্রকল্প নিয়েছে তাতে জনগণকে এ ধরনের (ঘটনার জন্য) আরো দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী মডেল অব ইকোনমী- জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রতিফলন। তারা দুর্নীতির জন্য একচেটিয়া কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট দিয়েছে, যাতে তাড়াতাড়ি টাকা বানানো যায়। কিন্তু এগুলোর ট্রান্সমিশন, ডিসট্রিবিউশনের সিনকোনাইজেশন তারা সেটা করে নাই। কারণ সেদিকে তারা মনোযোগ দেয় নাই। এখান টাকা বেশি আছে বলেই।

তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই সব পারমিশন কিন্তু আনসোলিসিটেড। এগুলোর টেন্ডার হয় নাই। সরকার নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছে। আইনও করা হয়েছে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও করা যাবে না এবং তাদেরকে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা, ফিক্সড চার্জসহ নিয়মিত পয়সা দিচ্ছে জনগনকে আজকে তার মূল্য দিচ্ছে।

আমির খসরু বলেন, সার্বিকভাবে প্রোপার প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে সরকার কিছুই করেনি। সেদিকে তারা মনোযোগী হয়নি। দুর্নীতির জন্য যা যা করা দরকার তাড়াহুড়া করে করেছে। এ জন্য একটি পলিটিক্যাল প্রাইজ জনগণকে পে করতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় দেখা দিলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ সহ সারাদেশের অর্ধেক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চলে যায়। সন্ধ্যায় সাড়ে ৬টার পর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ ফেরানোর কাজ শুরু করে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা। এদিকে সরকার এই বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এর নির্বাহী পরিচালনক ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।

নয়াশতাব্দী/এমএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ