ঢাকা, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

করোনায় উত্থান চাতুরিতে পতন

প্রকাশনার সময়: ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:১২
প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে যখন মানুষ ঘরবন্দি তখন বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ই-কমার্স। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে এই খাতে। ঘরে বন্দি মানুষের খাবার থেকে শুরু করে সব চাহিদা মেটাতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর দারস্থ হয়। ফলে অর্থনীতিতে নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু একটি চক্র ছড়ায় প্রতারণার জাল। জমে সাধারণ ক্রেতাদের নানা অভিযোগ। করোনায় জনপ্রিয়তা পাওয়া এই খাত খুব দ্রুতই আস্থাহীনতা দেখা দেয়। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এই খাতের নতুন সম্ভাবনা। ক্রমবর্ধমান এই খাত করোনাকালে উত্থান হলেও বছরের শেষ ভাগে দেখে পতন।

নানা ধাপ্পাবাজি অফারের মোহে ফেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে কাড়ি কাড়ি অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। এরপর হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করতে শুরু করে। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের আটক করা শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। বন্ধ হতে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই খাতে এখনো প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে তা সমাধান করে এই খাত অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব। তবে এতে সরকারকে নজরদারি করতে হবে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ২৫০০ ই-কমার্স সাইট রয়েছে। এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক বা এফ-কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা করছেন প্রায় ২ লাখ উদ্যোক্তা। অল্প দিনেই এই ই-কমার্স খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।

এফ কমার্সের সঙ্গে যুক্ত এ. আর ইম্পরিয়ামের কর্ণধার আরিফুল ইসলাম নামের এক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ই-কমার্সে বর্তমানে যে সমস্যা দেখা দিছে-এটাই সার্বিক চিত্র নয়। কয়েকটি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান প্রতারণা বা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। যারা অস্বাভাবিক ছাড় দিয়েছিল তারাই প্রতারণা করছে। কিন্তু বেশিরভাগ ই-কমার্সই অস্বাভাবিক ছাড় দেয়নি। আর যারা এই অস্বাভাবিক ছাড় দেয়নি তারা এখনো মার্কেটে কাজ করছে। যারা প্রতারণা করছে তাদের কারণে আমরা আগের থেকে অনেকটাই আস্থাহীনতায় রয়েছি। তবে আশা করছি ধীরে ধীরে এই সমস্যা সমাধান হবে। তিনি বলেন, অস্বাভাবিক ছাড় দেয়াই হয় মূলত প্রতারণার কারণে। ক্রেতাদের বলবো তারা যেন এসব অস্বাভাবিক ছাড়ের পেছনে না দৌড়ায়। তাহলে তারা আর প্রতারণার স্বীকার হবে না।

গ্রাহকরা জানায়, যেসব কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক ছাড় দিয়েছিল— সেসব কোম্পানিই মূলত এসব প্রতারণা করেছে। তারা টাকা বিদেশে পাচার করবে বলেই এভাবেই অস্বাভাবিক ছাড় দিয়েছে।

ইভ্যালি : অস্বাভাবিক ছাড় দিয়ে আলোচনায় আসে ই-বাণিজ্য মার্কেটপ্লেসটি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ রাসেল এই কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন। লোভনীয় অফার দিয়ে তাদের ক্রেতা টানার কৌশল মানুষের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি করার পাশাপাশি অনেক সমালোচনারও সৃষ্টি করে। ২০২১ সালে প্রতারণাসহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে । গ্রেফতার করা হয় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। কারাগারে যাওয়ার কারণে তাদের সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটি।

ই-অরেঞ্জ : গত ১৬ আগস্ট হঠাৎ করে গুলশানের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে কয়েকশ মানুষ। এর পর জানা যায়, তারা দেশীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ শপের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। অভিযোগ ওঠে, কোটি কোটি টাকার অর্ডার নিয়ে এখন পণ্য ডেলিভারি না দেয়ার।

এরপর এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাম আসে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার। যদিও তিনি অস্বীকার করেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক আগেই চুকিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু প্রতারিতরা তো আর তা মানতে রাজি না। তারা গিয়ে হাজির হন মাশরাফির বাসার নিচে। এরপর গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের মামলায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমানসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কিউকম : দেশীয় আরেকটা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকমের সিইও রিপন মিয়াও প্রতারণার অভিযোগে এখন জেলে। এর বিরুদ্ধেও ভোক্তাদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠান ও এর সিইও-র চেয়ে আলোচনায় আসে প্রতিষ্ঠানটিতে মোটা অঙ্কের টাকায় তিনি হেড অব সেলস কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন পদে যোগদান করা আরজে নিরব। অভিযোগ ছিল, কিউকম দখলে নেয়ার পরিকল্পনা করছিল নিরব। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করার সময় তিনি রহস্যময় ভূমিকা পালন করেছেন ।

আলিশা মার্ট : প্রতারণায় অন্যসব কোম্পানি থেকে একটু আলাদা আলিশা মার্ট। তারা নিরাপত্তা অজুহাত দাফতরিক সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। চারদিকে ই-কর্মাসের প্রতারণা যখন ফাঁস হচ্ছে তখন তাদের এমন কার্যক্রমে বোঝার বাকি থাকে না—তাদের অবস্থা। শুধু তাই নয়, তারা সরকারের কাছে ৩০০ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা চেয়ে বসে। সঙ্গে প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য নিরাপত্তাও চায় তারা।

ধামাকা : করোনাকালেই জনপ্রিয়তা পায় ধামাকা শপিং। প্রতারণার কারণে তাদের জার্নিও বেশি দূর যায়নি। প্রতারণা ও অর্থ-আত্মসাতের অভিযোগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে ধামাকা শপিংয়ের সিওও (চিফ অপারেটিং অফিসার) সিরাজুল ইসলাম রানাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে র্যাব। তাদের বিরুদ্ধে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি মামলা রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের পর র‌্যাব জানায়, ‘ধামাকা শপিং ডট কম’—এর কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই।

কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নুরুল আমিন নাদিম নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী বাদী হয়ে একটি মামলাটি দায়ের করেন। ওই মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়।

আদিয়ান মার্ট : অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনার সঙ্গে নাম জড়ায় আরে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আদিয়ান মার্ট। প্রতিষ্ঠানটি থেকে পণ্য কেনার জন্য চুয়াডাঙ্গায় আতিকুর রহমান নামের এক ব্যক্তি সাড়ে ১৮ লাখ টাকা দেন। তিনি মোটরসাইকেল ও ফ্রিজ কেনার জন্য এই টাকা দিয়ে ছিলেন। কিন্তু পণ্য বা অর্থ কিছুই পাননি এই গ্রাহক। ফলে বাধ্য হয়েই গত ২৮ অক্টোবর তিনি বাদী হয়ে কোম্পানিটির ৪ জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার মামলা করেন। পরে অভিযান চালিয়ে আদিয়ান মার্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ৪ জনকে আটক করে। পরের দিন তাদের আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক জেল হাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।

সিরাজগঞ্জ শপ ও আলাদীনের প্রদীপ : ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি চটকদার বিজ্ঞাপন ও বিশাল ছাড়ের অফারের ফাঁদে ফেলে হাজার হাজার গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করার অভিযোগ উঠে সিরাজগঞ্জের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সিরাজগঞ্জশপ.কম ও আলাদীনের প্রদীপ’র বিরুদ্ধে। এ দুই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও পণ্যের অর্ডার করে অগ্রিম টাকা দিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন হাজারো গ্রাহক। অভিযোগ আছে, গ্রাহকদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন প্রতিষ্ঠান দুটির কর্ণধাররা, তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে দুই প্রতিষ্ঠানের অফিসও। অনলাইন ব্যাংকিং নগদ’র মাধ্যমে টাকা ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকায় হতাশায় ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা।

পদক্ষেপ নেয় সরকার : চারদিকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠলে নড়েচড়ে বসে সরকার। করা হয় নতুন নিয়ম। এরপর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন (ইউবিআইডি) নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। আসছে বছর ইউবিআইডি ছাড়া ই-কমার্স ব্যবসা করার কোনো সুযোগ থাকবে না। এটি চালু হওয়ার পর রেজিস্ট্রেশনবিহীন কোনো কোম্পানি দেশে অনলাইনে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ