ঢাকা, সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বছরজুড়ে আলোচনায় মাদক কিশোর গ্যাং-টিকটক

প্রকাশনার সময়: ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:৪৪
সংগৃহীত ছবি

বিদায়ী বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল মাদক, কিশোরগ্যাং, টিকটক এবং লাইকি। এসব ‘ব্যাধি’তে বিপর্যস্ত ছিল পুরো বছর। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঝুঁকে পড়ে প্রাণঘাতী নেশার দিকে।

প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে আসে নতুন নতুন মাদক। মাদকে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। ভেজাল মাদক ইতোপূর্বে কেড়ে নিয়েছে বেশকিছু তরুণ প্রাণ। গত জানুয়ারিতেই ভেজাল মদে ঢাকা এবং বগুড়াসহ সারাদেশে ৪০ জনের মৃত্যু হয়। মাদককে ঘিরে কিশোর-তরুণরা গড়ে তোলে গ্যাং বা গ্রুপ। আর এ গ্যাং-গ্রুপের সদস্যরা লিপ্ত হয় নানা অপকর্মে। ডিসেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে কেবল যশোরেই কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন দুই জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। রাজধানীসহ সারাদেশেই দাপট লক্ষ্য করা গেছে কিশোর গ্যাং সদস্যদের। বিদায়ী বছরে ঘটেছে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনাও।

টিকটক হচ্ছে ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ। টিকটকের মতো লাইকি নামে আরও একটি অ্যাপ কম বয়সী বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিনোদন জগতের সেলিব্রেটিরাও এই দুটি অ্যাপে বিভিন্ন ভিডিও শেয়ার করেন। টিকটক ভিডিও তৈরি করতে অনেক কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কিশোর ও তরুণী টিকটকাররা উচ্ছৃঙ্খল পোশাক পড়েন, অস্বাভাবিক আচরণ করেন। এলাকাভিত্তিক টিকটকের গ্যাংগুলো বিভিন্ন পার্ক, খোলা জায়গায়, ফুটপাত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে একত্রিত হয়ে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করার নামে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, ইভ টিজিং, পথচারীদের গতিরোধ, বাইক মহড়াসহ নানা অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। আবার টিকটক করতে এসে অনেক কিশোরী-তরুণী ধর্ষণের শিকারও হয়েছেন। এমনকি টিকটকারদের ফাঁদে পড়ে পাচারের শিকার হচ্ছেন অনেক নারী। একটি টিকটকার গ্রুপ আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রে যুক্ত হয়ে নারী পাচার করার প্রেক্ষাপটে জোরালো অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

নিখোঁজ হওয়ার আট দিন পর গত ২৩ মে হাফিজুর রহমান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের লাশ শনাক্ত করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হাফিজ নিজেকে জড়িয়েছিলেন গ্যাং কালচারে। এই গ্যাংয়ের দলনেতা হলো সাদমান সাকিব ওরফে রুপল। গত ১৬ মে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু সন্তানের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাহিনুদ্দিন নামের এক যুবককে। এর নেপথ্যেও ছিল গ্যাং কালাচার। সুমনের নেতৃত্বে পল্লবীতে গড়ে উঠেছিল একটি গ্যাং।

কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে বিদায়ী বছরের প্রথম দিনে রাজধানীর বনানীতে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় কিশোর আরিফ (১৬)। অপহরণের তিনদিন পর গত ২১ মে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে অর্ধগলিত অবস্থায় মুমিন (১৬) নামের এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাতেও কিশোর গ্যাং জড়িত বলে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) জানিয়েছে। গত ২৭ মে রাতে কুমিল্লায় উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে এক স্কুলছাত্রের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় গ্যাং সদস্যরা। ৩০ মে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপ লাঠিসোঁটা নিয়ে একপক্ষ অপর পক্ষের ওপর হামলা চালায়। গত ১৩ মার্চ আলোচিত তাহমিনা সিমি নামের এক কিশোরী গ্যাং লিডারকে গ্রেফতার করে চট্টামের পতেঙ্গা থানা পুলিশ।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে, একই সমাজ ব্যবস্থায় দরিদ্র শ্রেণি ও উচ্চবিত্তের বসবাস, অস্ত্র ও মাদকের দৌরাত্ম্যসহ নানা কারণে গ্যাং কালচারে জড়াচ্ছে কিশোররা। জুনিয়রদের নিরাপত্তাহীনতা, ভিনদেশি কালচারের অনুপ্রবেশ, বিশৃঙ্খল পারিবারিক পরিবেশ, কর্মহীনতা এবং হতাশাবোধ থেকে বখাটে হচ্ছে তারা। একাকিত্ব, অভিভাবকের সান্নিধ্য না পাওয়া, শিক্ষকদের অতিমাত্রার শাসন, খারাপ ফলাফল, সহপাঠীর মাধ্যমে বিদ্রুপ এবং স্কুলের ম্যানেজমেন্টের অব্যবস্থাপনার ও পাঠদান প্রক্রিয়া ব্যহত হওয়ার বিষয়গুলো উস্কে দিচ্ছে গ্যাং কালচার। কো-এডুকেশনে হিরোইজম, খারাপ সহচার্য, আড্ডাবাজী, অপরাধ জগতে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা থেকে অনেকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হচ্ছে। এছাড়া রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার হাতছানি, অল্প বয়সে যৌন আসক্তি, হীনম্মন্যতা থেকে ব্যক্তি সত্ত্বা প্রমাণের চেষ্টা, দস্যুপনা, দূরন্তপনা ও চরমপন্থা মনোভাব থেকেও গ্যাংয়ে যোগ দেয়ার প্রতণতা তৈরি হচ্ছে।

বিদায়ী বছরে যে কয়টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেসবের মধ্যে কুমিল্লার কাউন্সিলর সোহেল ও তার সহযোগী হত্যা (জোড়া খুন), লঞ্চের কেবিনে গৃহবধূ খুন এবং টাঙ্গাইলের ট্রিপল মার্ডারে ঘটনা উল্লেযোগ্য।

২২ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কুমিল্লা নগরের পাথুরিয়াপাড়া থ্রিস্টার এন্টারপ্রাইজে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় আরও পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। ১০ ডিসেম্বর বরিশালে লঞ্চের কেবিন থেকে গৃহবধূ শারমিন আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে ওই গৃহবধূকে তার স্বামীই হত্যা করেছেন।

৩০ অক্টোবর টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে একটি বাসায় দুই নারীসহ তিনজনকে হত্যা ও একজনকে আহত করা হয়। বিষয়টি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি বিশেষ মনিটরিং সেলের মাধ্যমে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নূরে আলম মিনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নেহাল করিম নয়া শতাব্দীকে বলেন, দেশে আইনের শাসন না থাকা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা সীমাবদ্ধতা, স্কুল কলেজ বন্ধ, করোনায় মানুষের আয় কমে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয় বা সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটি, পারিবারিক অনুশাসনের অভাব, দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা বা মানসম্মত শিক্ষার অভাব, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, খেলা-ধুলার বব্যস্থা না থাকা, দুষ্ট সহচার্য এবং ব্যক্তিত্ববোধের অভাবসহ নানা কারণে মাদক, কিশোর গ্যাং, টিকটক এবং লাইকি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এসব সমস্যা সমাধানে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বলেন, পরিবার, স্কুল কর্তৃপক্ষ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একযোগে কাজ করতে হবে। খেলার মাঠ এবং ক্লাবসহ পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। পারিবারিক শিক্ষা সমন্বত রাখতে হবে। সন্তানকে বিভিন্ন চারিত্রিক গুণাবলীর শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানদের সময় দেয়ার পাশপাশি তাদের বেশভূষার উপর খেয়াল রাখতে হবে। স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে কিনা, স্কুল ও এর আশপাশে মাদক সেবন হয় কিনা, র্যাগিং হয় কিনা ইত্যাদি বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, টিকটকার ও কিশোর ও কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক ও নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যে কোনো ধরনের অপরাধ বড় আকার ধারণ করার আগেই সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করতে হবে।

র‌্যাব অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সব অপরাধের মূলে হলো মাদক। মাদককে কেন্দ্র করেই কিশোর গ্যাং এবং টিকটক-লাইকি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক শ্রেণির লোক সব ধরনের অপরাধে জড়িত। এরই মধ্যে এদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী অভিযান চলছে।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ