ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৩, ২০ আশ্বিন ১৪৩০, ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৫

কোন পথে জি এম কাদের!

প্রকাশনার সময়: ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৮:৩২
ছবি : সংগৃহীত

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে আবারও রাজনৈতিক পেক্ষাপটে জাতীয় পার্টি (জাপা)। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে নাকি বিএনপির সঙ্গে যোগ দেবে। নাকি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে জাতীয় পার্টি। এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। আগামী নির্বাচনে জাপা এক্স ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তুরুপের টেক্কা হিসেবেও জাপা গুরুত্ব পাচ্ছে মহাজোট ও বিরোধী জোটে। ঠিক সেই মুহূর্তে পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ভারত সফরে যান। তিন দিনের এ সফর নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন। পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে কাউন্সিলের ডাক দেন।

তারও আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন রওশন এরশাদ। এরপর রাজনৈতিক মহলের গুঞ্জন উঠেছে দেবর-ভাবির সমঝোতা নাকি সরকারবিরোধী জোটে যাবে জি এম কাদের। এখন জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে জাতীয় পার্টি ও জি এম কাদের কোন দিকে যাবে?

দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, নির্বাচন এলেই জাতীয় পার্টিতে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এটাও সেই নতুন খেলার অংশ। তবে জাতীয় পার্টি এখন খেলার ঘুটি হয়নি। জি এম কাদের এখনো শক্ত অবস্থান নিয়ে আছেন। তাই কিছু দিনের মধ্যে রাজনীতিতে নতুন কিছু ঘটতে পারে।

দলীয় সূত্রমতে, সম্প্রতি ভারত সফরকালে বিজেপিসহ সাবেক রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে বৈঠক হয় জি এম কাদেরের। বৈঠকে আগামী সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। ভারত পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নো ডিভিশন উইথ ফার্স্ট লেডি (রওশন এরশাদ)’ এবং ‘নো চেইঞ্জ অব মেইন ট্র্যাক’।

অর্থাৎ রওশন এরশাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিভাজন নেই। প্রধান ট্র্যাকের কোনো পরির্বতন নেই বলে জানায় ভারত। তাই জাপাকে আগের ধারাতেই থাকতে বলা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে রওশন এরশাদকে সমর্থন এবং তার নেতৃত্বেই নির্বাচনে অংশ নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সঙ্গে থাকতে বলা হয় জি এম কাদেরকে। তাই পার্টির চেয়ারম্যান বিমানবন্দরে ভারত সফর নিয়ে মুখ খুলতে পারেননি।

যদিও জি এম কাদের এখনো নিজের আগের সিদ্ধান্তে অটল। বিদেশি বা দেশের ভিতরে কারো চাপে মাথা নত করতে নারাজ তিনি। দলীয় প্রতীক ‘লাঙল’ বা চেয়ারম্যান পদ হারানোর চাপ দিলেও তিনি সরতে নারাজ। তাই শেষ পর্যন্ত যারা পাশে থাকবে তাদের নিয়েই সরকারবিরোধী বিএনপি জোটে যোগ দিতে পারেন।

নিরপেক্ষ নির্বাচনের এক দফা দাবিতে আন্দোলনে রাজপথে শামিল হতে পারেন। কারণ হিসেবে দলের কয়েকজন নেতা বলছেন, ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে আসন বণ্টন, নির্বাচনকালীন সরকার এবং নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকারের জি এম কাদেরকে রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় জাতীয় পার্টি। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দল।

সূত্র আরও জানায়, কোনো ধরনের প্রচার ছাড়াই থাইল্যান্ডে ট্রানজিট নিয়ে সিঙ্গাপুর গেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু। সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মির্জা আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাপা মহাসচিব।

চুন্নুর সিঙ্গাপুর সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠ জাতীয় ছাত্র সমাজের শীর্ষ এক নেতা। তিনি বলেন, জি এম কাদেরের সিগন্যালেই তিনি সিঙ্গাপুর গেছেন। সেখানে বৈঠকও করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিন দিনের ভারত সফর শেষে গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন জি এম কাদের। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে যায়নি দলের কোনো কো-চেয়ারম্যান। যদিও এর আগে সফরগুলোতে তাদের দেখা যেত। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়াও ঢাকায় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিটার হাস, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন জি এম কাদের।

ওই সব আলোচনায় জাতীয় পার্টিকে এখনই কোনো দিকে হেলে না পড়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ভারত সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় পার্টির পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। দলীয় প্রার্থীদের একটি তালিকাও প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। এই তালিকা নিয়েও দলের মধ্যে গ্রুপিং আরও প্রকট হয়েছে।

জি এম কাদের দেশের আসার পর কাদেরপন্থি জাপার কো-চেয়ারম্যান মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, সালমা ইসলাম এমপি, গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি, রুস্তম আলী ফরাজি এমপি, পীর ফজলুর রহমান মেজবাহ এমপি, রওশন আরা মান্নান এমপি, নাজমা আক্তার এমপি, নাসরিন জাহান রত্ম এমপি, হাফিজ উদ্দিন এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবুল কাশেম রওশন এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

এদের মধ্যে অনেকেই ম্যাডামের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচন ঘিরে জাতীয় পার্টি এক ‘গোলক ধাঁধা’র মধ্যে পড়েছে। প্রকৃত অবস্থা জানতে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে গত ডিসেম্বরেই প্রধানমন্ত্রী একটি বার্তা তাদের দিয়েছিল। তখন পার্টিকে এককভাবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দল গুছানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।

জাপাকে ঘিরে সরকারের তরফ থেকে কিছু চিন্তাভাবনা আগে থেকেই চলমান আছে। তাই আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এক্স ফ্যাক্টর। তাই জাতীয় পার্টিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বিরোধী দল। রাজনীতির ময়দানে শুরু হয়েছে নতুন তৎপরতা। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি যে জোটে যাবে তারা চালকের আসনে আসবে।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সেন্টু নয়া শতাব্দীকে বলেন, আগামী নির্বাচন ঘিরে দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশে সারা দেশে জাতীয় পার্টিকে গোছানো হচ্ছে। জেলায় জেলায় মিটিং-সভা সেমিনার ও জেলার কাউন্সিলও করা হয়েছে। আমরা এককভাবে না জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে এটা আরও পরে জানা যাবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের বিএনপির সঙ্গে জাপা মহাসচিব চুন্নুর বৈঠকের খরবটি ভুয়া। দলের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূইয়া বলেন, বিমানবন্দরে জি এম কাদেরকে স্বাগত জানাতে দলীয়ভাবে কাউকে যেতে বলা হয়নি। তাই নেতাকর্মীরা কেউই যাননি। একটি মহল কো-চেয়ারম্যানদের নিয়ে উদ্দেশ্যভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। রওশন এরশাদ নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি দলের চেয়ারম্যান না। দলের থেকে যাদের বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কার করা হয়েছে তার এসব করিয়েছে এবং মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যাদের বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের দলে আর ফেরানো হবে না।

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, নির্বাচন এলেই জাতীয় পার্টি বিএনপির দিকে যাবে নাকি আওয়ামী লীগের সাথেই থাকবে। নাকি একাই নির্বাচনকে করবে এমন নানা কিছু আলোচনা সামনে আসে। এবারও সেটা হচ্ছে। তবে দল নিজের মতো করেই সিদ্ধান্ত নেবে।

নয়া শতাব্দী /এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ